রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন করার বীভৎস সেই ইতিহাস

 

কক্স টিভি ডেস্কঃ

রোহিঙ্গাদের জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে বীভৎস ইতিহাস। অনেক রোহিঙ্গার আহত হাতে একটি মলিন সবুজ পরিচয়পত্র। কালের আবর্তনে সেই পরিচয়পত্রে তাদের সেই ছবিটি ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

এক ভুক্তভোগী রোহিজ্ঞা নাগরিক নুরুল হক বলেন, তিনি ও তার পরিবার মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক। কিন্তু তার দেশ সেই নাগরিকত্ব অস্বীকার করেছে।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বিবর্ণ পরিচয়পত্রটি পাতলা মাদুরের ওপর রেখে নুরুল হক বলেন, আমরা মিয়ানমারে সবকিছু ফেলে এসেছি।

এই পরিচয়পত্র ও তাঁবুর ভেতরে অন্যান্য পরিবারের কাছে যা আছে, তা তাদের অতীতের জীবনকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। তাদের হৃদয়ে একটি সুদূর ইচ্ছা গেঁথে আছে- একদিন তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবেন।

কিন্তু তাদের সামনে রয়েছে এক জটিল আমলাতান্ত্রিক উপায় মাত্র।

পরিকল্পিতভাবে নাগরিকত্ব হরণ করার পর তা ফিরে পেতে তাদের কতদিন অপেক্ষা করতে হয়, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

মিয়ানমারে নাগরিকত্বের প্রশ্নে একের পর এক নীতিমালা ও পদক্ষেপের জালে আটকে আছে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ। মিয়ানমারে রাষ্ট্রহীনদের তালিকা করলে মুসলিম রোহিঙ্গাদের নামই সবার আগে চলে আসবে।

রোহিঙ্গাদের ছাড়াও কিছু নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠী রয়েছে, যারা মিয়ানমার সরকারের পরিকল্পনাহীন ও সুনির্দিষ্ট নাগরিকত্ব আইনের করালগ্রাসের মধ্যে পড়েছেন।

১৯৮২ সালে তখনকার সামরিক জান্তা সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘বামার’ সম্প্রদায়ের জন্য একটি নাগরিকত্ব আইন তৈরি করে। এর মাধ্যমে অন্য সম্প্রদায়কে জাতিগত নৃগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করে তাদের পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়।

মিয়ানমার সরকার ১৯৮২ সালের আইনের ওপর ভিত্তি করে ধারাবাহিকভাবে নিয়মবহির্ভূত নাগরিকত্ব পরিকল্পনা তৈরি করে যাচ্ছে।

এতে শর্ত দেয়া হয়েছে- নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যারা ১৮২৪ সালের ব্রিটিশ বিজয়ের আগে মিয়ানমারে বসতি স্থাপন করেছিলেন, তারাই কেবল পূর্ণ নাগরিকত্ব পাবেন।

কিন্তু মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো দেখেছে, রোহিঙ্গাসহ কয়েকটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে অবাঞ্ছিত ও রাষ্ট্রহীন করতেই মিয়ানমার সরকার এমন উদ্যোগ নিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা দা আরাকান প্রজেক্টের ক্রিস লিউয়া বলেন, রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করতেই তাদের রাষ্ট্রহীন ঘোষণা করা হয়েছে।

গত আগস্টে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।

নুরুল হক ও তাদের পরিবারও সেই সময় নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে চলে আসেন। সবকিছু ফেলে রেখেই তাদের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে আসতে হয়েছে।

একটি জরিপে দেখা গেছে, শরণার্থী শিবিরে নতুন আগমনকারী ৯৪ শতাংশের কাছে কোনো পরিচয়পত্র নেই। নুরুলের মতো কেউ কেউ পরিচয়পত্রটি সঙ্গে নিয়ে আসতে পেরেছেন, যা একেবারেই বিরল বলা চলে।

কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থীর কাছে আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র বণ্টন করা হয়েছিল। নুরুলের দাদার ওই সবুজ পরিচয়পত্রটির মতো যা ছিল দুর্বল ও ক্ষয়ে যাওয়া কাগজ।

এর পর তাদের হাতে সাময়িক হলুদ কার্ড দেয়া হয়। সর্বশেষ নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার আগে তাদের কাছে রসিদের মতো দেখতে কাগজ বিতরণ করা হয়।

গত কয়েক দশকে মিয়ানমার সরকার তাদের সব ধরনের পরিচয়পত্র অবৈধ ঘোষণা করে। তাদের কাছ থেকে এসব রসিদ বা আইডি কার্ড কেড়ে নেয়া হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় ও সামান্য কিছু অধিকারের মধ্যে তাদের সবকিছু সীমিত করে দেয়া হয়।

নুরুলের দাদার পরিচয়পত্রটিকে জাতীয় নিবন্ধন কার্ড বলা হতো। মিয়ানমারে বিদেশি নয়, এমন পুরুষ অধিবাসীদের এই কার্ড দেয়া হয়েছিল।নারীদের দেয়া হয়েছিল গোলাপি বর্ণের কার্ড।

১৯৮২ সালে মিয়ানমারের জান্তা সরকার নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে নতুন নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করে। কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে সবুজ ও গোলাপি রঙের কার্ড কেড়ে নিয়ে তাদের হাতে সাদা পরিচয়পত্র ধরিয়ে দেয়।

নুরুল হকের পরিবার তার দাদার সবুজ পরিচয়পত্রটি সরকারের কাছে হস্তান্তর না করে মাটির নিচে রেখে দেয়।

তিনি বলেন, যতটা সম্ভব নিরাপদ জায়গায় আমরা এটি রেখে দিয়েছিলাম।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার আগে মাটি খুঁড়ে পুরনো পরিচয়পত্রসহ কিছু ছবি নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন তারা। সঙ্গে নতুন করে দেয়া সাদা কার্ডটিও ছিল।

মিয়ানমারে তার এই পরিচয়পত্রটি একেবারে মূল্যহীন জেনেও সযত্নে রেখে দিয়েছিল। কারণ তার ভাষায়, আমরা যে মিয়ানমারের নাগরিক ছিলাম- এটিই তার প্রমাণ।

নুরুল বলেন, আসছে দিনগুলোতে আমি কোথা থেকে এসেছি, তা প্রমাণ করতে এই কার্ডটির প্রয়োজন পড়বে।

মিয়ানমারের পার্লামেন্টে, রাস্তায় মিছিলের স্লোগান ও চায়ের দোকানে এখন শোনা যাচ্ছে- দেশটিতে কোনো রোহিঙ্গা নেই।

এমনকি দেশে কোনো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নেই, এমন ঘোষণা দিতে সম্প্রতি একজন আইনপ্রণেতা দেশটির সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের মূল পরিচয় নাই করে দিতে তাদের বাঙালি বলে ডাকা হয়। অথচ রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ ইতিহাস আছে।

নুরুল হকের মতো হাসিনা খাতুনের কাছেও তার বাবার সবুজ রঙের পরিচয়পত্রটি আছে। তাদের আগেরটির সমান মর্যাদার কার্ড দেয়া হচ্ছে না ভেবে তিনি এটি রেখে দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, সেনাবাহিনী তাদের ঘর অগ্নিসংযোগ করে ভস্মীভূত করে দিয়েছে। কিন্তু তিনি জ্বলন্ত ঘরের ভেতরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢুকে তার পরিবারের পরিচয়পত্রটি নিয়ে এসেছেন।

এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করার জন্য তার প্রতিবেশীরা তাকে পাগল বলেছিল। যদিও এই আইডি কার্ডের ন্যূনতম মূল্যও নেই এখন।

তিনি বলেন, আমি আমার সবকিছু হারিয়েছি। কিন্তু এই কার্ডটিকে রক্ষা করতে পেরেছি। এটি আমার কাছে অনেক মূল্যবান। কারণ এই কার্ড বলে দিয়েছে- আমরা মিয়ানমারের অংশ ছিলাম।

মিয়ানমারে দাপ্তরিকভাবে ১৩৫টি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের রাখা হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিক চিজম্যান বলেন, ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন সংস্কার করে রোহিঙ্গাদের তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। কারণ এই আইন দিয়েই তাদের অধিকার হরণ করা হয়েছে।

মিয়ানমারে আইন কীভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয়, তা নিয়ে গবেষণা করেছেন চিজম্যান।

মিয়ানমার সরকার এখন রোহিঙ্গাদের নতুন এক ধরনের পরিচয়পত্র দিতে চাচ্ছে। যেটির নাম দিয়েছে- ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ডস। দেশটির ব্যাপক বিতর্কিত বহু ধাপের নাগরিকত্ব প্রণয়ন প্রক্রিয়ারই অংশ এটি।

দেশটির সরকার যখন বলেছে, কেবল কার্ডধারী নাগরিকত্বের অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। তখন রোহিঙ্গারা তাতে সই করেননি। কারণ তাদের ভয়, সরকার নতুন আরেকটি কার্ড দিয়ে তাদের আরও ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফেলে দিতে পারে।

৫৫ বছর বয়সের লালু বলেন, গত বছর মিয়ানমার সরকার তাদের কাছ থেকে সাদা কার্ড ফেরত নিয়ে গেছে। ২০১৫ সালে সরকার ওই কার্ড অকার্যকর ঘোষণা করেছিল। সাদা কার্ডের বদলে তাদের একটি স্লিপ পেপার দেয়া হয়েছিল।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তাকে বলেছিল, এই কার্ড নিয়ে তিনি দেশের যে কোনো জায়গায় যেতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে আমি এক কিলোমিটারের বেশি যেতে পারতাম না।

পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন করে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করতে আইডি কার্ড দেয়া হচ্ছে। নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা অধিকাংশ রোহিঙ্গার এটিই একমাত্র আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.