পরিবহনে যৌন সন্ত্রাস। ভয়ংকর পরিণতি! অভিনন্দন কোতয়ালী থানা পুলিশকে

চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ

প্রতিদিনের মতো মাদ্রাসায় যাচ্ছিলেন রেহনুমা (ছদ্মনাম)। জামালখান মোড়ে আসতেই প্রাইভেট কার আরোহী এক যুবক তার কাছে রীমা কমিউনিটি সেন্টারের কোনদিকে ঠিকানা জানতে চায়। রেহনুমা আঙুলের ইশারায় দিক বাতলে দেয়। কিন্তু যুবক তাকে অনুরোধ করে একটু এগিয়ে দেখিয়ে দিতে। যুবকের অনুরোধে একটু এগুতেই কারের পেছনের দরজা খুলে আরেকজন যুবক টান দিয়ে গাড়িতে তুলে নেয় রেহনুমাকে। গাড়িতে তুলেই দ্রুত টান দেয় প্রাইভেট কার চালক সেই যুবক।
ঠিকানা জানতে চাওয়া সেই যুবক আসলে একজন প্রাইভেট কার চালক। তার নাম শাহাবুদ্দিন। গাড়ীর পেছনে বসে থাকা আরেকজনও একই পেশার। নাম তার শ্যামল। তারা তাদের মালিকের সন্তানদের স্কুলে দিয়ে আসা এবং নিয়ে আসার মাঝে যে সময় পায় সেই সময়েই মেতে উঠে এক বিভৎস অপরাধে। তাদের আজকের টার্গেট এই রেহনুমা।
চলন্ত গাড়িতে পেছনের সিটে রেহনুমাকে প্রথম ধর্ষণ করে শাহাবুদ্দিন । এসময় ভিডিও ধারণ করে শ্যামল। পরে শ্যামল ধর্ষণ করে। এসময় ভিডিও ধারণ করে শাহাবুদ্দিন । পরে তাকে গণি বেকারির মোড়ে নামিয়ে দেয় এই দুইজন। যাওয়ার সময় তাকে যখনই মোবাইলে ডাকা হবে তখনই তাদের কাছে যেতে এবং এ বিষয়ে মুখ না খোলার হুমকি দেয়। অন্যথায় ইন্টারনেটে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেয় তারা। সেদিন লজ্জা ও ভয়ে কাউকে কিছুই বলেনি রেহনুমা। পরদিন সকাল থেকেই ফোন করতে থাকে এই দুই নরপিশাচ। তাদের অব্যাহত ফোনে অবশেষে সাহস করে ভাইকে সব বলে দেয় রেহনুমা। সব ঘটনা শুনে বোনকে নিয়ে নগরীর কোতোয়ালি থানায় যায় অভিযোগ করতে। থানার ওসি মহসিন সাহেব যখন তাদের অভিযোগ শুনছিলেন সে সময়েই তাদের দুইজনের ফোন আসে রেহনুমার মোবাইলে। তৎক্ষণাতই ওসি সাহেব অভিযানের পরিকল্পনা নেয়।
পরিকল্পনামাফিক রেহনুমা দিদার মার্কেট এলাকায় গিয়ে তাদের সাথে দেখা করার কথা বলে। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেয় কোতোয়ালি থানা পুলিশ সদস্যরা। কিন্তু কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা রেহনুমাকে নিয়ে কারটি দ্রুত টান দেয় গাড়ি। তাদের আটকাতে প্যারেড ময়দান, আন্দরকিল্লাহসহ বিভিন্ন মোড়ে ব্যারিকেড দেয় পুলিশ। কিন্তু তারা ফিল্মি স্টাইলে সব ব্যারিকেড ভেঙে পালিয়ে যায়। পরে তারা লালদিঘী এলাকা পর্যন্ত এলে পুলিশ কোতোয়ালি মোড়ে কৃত্রিম যানজট তৈরি করে ব্যারিকেড দেয়। এতে কাজ হয়। কারণ বিশাল গাড়ির ব্যারিকেড এড়ানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
উপায়ন্তর না দেখে জেলা পরিষদের সামনে গাড়ি ও অপহৃতকে ফেলে দৌড় দেয় তারা। অল্প দূরেই হকার্স মার্কেট। পালিয়ে মার্কেটের লোকদের সাথে মিশে যায় তারা। হকার্স মার্কেট তখন লোকে লোকারণ্য।তাদের খুঁজে বের করাটা কিছুটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু এতে বিচলিত না হয়ে মুহর্তের সিদ্ধান্তেই পুলিশ সদস্যরা তিন গ্রুপে ভাগ হয়ে যায়। একটা গ্রুপ গাড়ি ও অপহৃতকে নিরাপদে থানায় নিয়ে আসে। একটা গ্রুপ স্থানীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আর বাকি গ্রুপটা ওই দুইজনকে গ্রেফতারে লেগে পড়ে। ব্লক রেইড তল্লাশির এক পর্যায়ে ডিসি রোড এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় শ্যামল দে কে। অব্যাহত জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে শ্যামল সব অপকর্ম স্বীকার করে নেয়। বলে দেয় শাহাবুদ্দিনের অবস্থানও।শ্যামলের দেওয়া তথ্যানুযায়ী শাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতারে ফিশারিঘাট মেরিনার্স রোড এলাকায় গেলেই পুলিশের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে শাহাবুদ্দিন ও তার দল। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও গুলি চালাই। প্রায় মিনিট দশেক ধরে চলে এই বন্দুকযুদ্ধ। গোলাগুলি থামার পর সেখানে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় শাহাবুদ্দিনের গুলিবিদ্ধ শরীর। তার বুকে মোট দুইটি গুলি লাগে। এসব গুলি শরীরে বিদ্ধ হয়ে উপুড় হয়ে সে পড়েছিল বালির উপর। পরে চমেক হাসপাতালে নিলেও তাকে আর বাঁচানো যায়নি। আর এমন ভয়ঙ্কর পরিণতির মাধ্যমেই শেষ হয় শাহাবুদ্দিনের বিভৎস অপরাধের।শাহাবুদ্দিনকে এখানেই থামাতে সমর্থ হয়েছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। নাহলে সাহাবুদ্দিন একদিন আরের রসু খাঁ’য় পরিণত হতো।
এই ঘটনা নিষ্পত্তির পর অনেকেই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। ধন্যবাদ দিয়েছে কোতোয়ালি থানার চৌকষ ওসি মহসিন সাহেবকে। পুলিশ সদস্যদের ভাসিয়েছেন প্রশংসায় । কতোয়ােলী থানার ওসি মহসিন সাহেব বলেন, এখানে মূল ধন্যবাদ ও প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য সেই মেয়ে এবং তার পরিবার। প্রথমত মেয়েটি সাহস করে তার পরিবারকে জানিয়েছে। আর দ্বিতীয়ত তার পরিবার পুলিশের উপর আস্থা রেখেছে। আমি সবাইকে উদাত্ত আহ্বান জানাব, আপনার সাথে যে অন্যায়ই ঘটুক আমাদের জানান। আমাদের সহযোগিতা নিন। কথা দিচ্ছি, নিরাশ করবো না। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতিরপক্ষ থেকে এ আপারেশনে জড়িত সকল পুলিশ সদস্যকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, দেশের সকল পুলিশ কর্মকর্তা যদি ওসি মহসিন সাহেবের মত এগিয়ে আসে তাহলে গণপরিবহনে নারী নির্ষাতনসহ সকল অপরাধ নির্মুল হতে বাধ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.