ঈদুল আযহায় ২৩৭ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত ৯৬০ জন আহত ——বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

ঈদুল আযহায় ২৩৭ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত ৯৬০ জন আহত ——বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

বিগত ঈদুল আযহায় দেশের সড়ক মহাসড়কে ২৩৭ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত ৯৬০ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

আজ ৩১ আগস্ট শুক্রবার সকালে নগরীর সেগুনবাগিচাস্থ ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঈদুল আযহায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন-২০১৮ তে এই তথ্য তুলে ধরেন। সংগঠনটির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল প্রতিবেদনটি তৈরি করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবছর ঈদ কেন্দ্রিক সড়ক দুর্ঘটনা আশংকাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় সংগঠনটি ঈদ যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানীর বিষয়টি গত চার বছর যাবত অত্যন্ত দক্ষতা ও বিশ্বস্থতার সহিত পর্যবেক্ষণ করে আসছে। যা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। বিগত ঈদুল ফিতরে অত্র সংগঠনের সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনে দুর্ঘটনা, প্রাণহানী ও ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হওয়ায় গণ-মাধ্যম ও সরকারের ভেতরে বাইরে এমনকি মহান জাতীয় সংসদেও এই প্রতিবেদন নিয়ে ব্যাপক আলোচিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবীতে আন্দোলনে সারাদেশে ব্যাপক নাড়া দিতে সক্ষম হয়। এহেন প্রেক্ষিতে সরকার সড়ক নিরাপত্তায় ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করে। পুলিশ, র‌্যাব, বিআরটিএ ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার নানামুখী তৎপরতা ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোড়দার থাকায় এবারের ঈদযাত্রায় বিগত ঈদুল ফিতরের তুলনায় দুর্ঘটনা ১৪.৪৪ শতাংশ, প্রাণহানী ২৩.৫৯ শতাংশ এবং আহত ২৪.১১ শতাংশ কমেছে। তবে গত ঈদুল আযহার তুলনায় দুর্ঘটনা ১৩.৫০ শতাংশ ও আহত ১১.৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে শুরু করে সবাই সড়ক নিরাপত্তা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যখন রাত-দিন গলদঘর্ম তখনও কিছু অসাধু অতি লোভী মালিকও পরিবহন শ্রমিকের বেপরোয়া মানসিকতায় সড়কে নৈরাজ্য ও সড়ক হত্যা কোন ভাবেই থামানো যাচ্ছে না।

বিগত ঈদুল ফিতরে উদ্বেগজনক প্রাণহানীতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সড়ক নিরাপত্তায় দুরদৃষ্টি সম্পন্ন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিবের নেতৃত্বে সড়কের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে শৃঙ্খলা ফেরাতে আরেক দফা নির্দেশনা ইতিমধ্যে প্রদান করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সব নির্দেশনা দিয়েছেন তা আমলে নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে সড়কে মৃত্যুর যে গণমিছিল চলছে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হবে বলে আমরা মনে করি।
ঈদুল আযহার যাত্রা শুরুর দিন ১৬ আগস্ট থেকে ঈদ শেষে বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফেরা ২৮ আগস্ট পর্যন্ত বিগত ১৩ দিনে ২৩৭ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত ৯৬০ জন আহত হয়েছে ।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের সদস্যরা বহুল প্রচারিত ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক দৈনিক ও অনলাইন দৈনিক এ প্রকাশিত সংবাদ মনিটরিং করে এ প্রতিবেদন তৈরি করে।
হতাহতের মধ্যে ১২ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ০৪ জন চিকিৎসক, ০২ জন প্রকৌশলী, ০২ জন সাংবাদিক, ০২ শিক্ষক, ২০ শিক্ষার্থী, ৪২ জন চালক-হেলপার, ৫৯ জন নারী , ৩৪ জন শিশু ও ০৮ জন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী রয়েছে।

এই সময়ে নাটোরের লালপুরে বাস ও লেগুনা সংঘর্ষে ১৫ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয় ।ফেনীর মুহুরীগঞ্জে গরু বোঝাই ট্রাক – মাইক্রো সংঘর্ষে একই পরিবারের ৫ জনসহ ৭ জন নিহত হয় । নরসিংদীতে বাস -লেগুনা সংঘর্ষে ১১ জন নিহত হয়। ফেনীর লেমুয়ায় বাস- সিএনজির মুখোমুখী সংঘর্ষে ৭ জন নিহত হয়।এদিকে ভাড়া নিয়ে তর্কের জেরে চট্টগ্রামের সিটি গেইটে রেজাউল করিম রনি নামে এক যুবককে বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়, ময়মনসিংহের নান্দাইলে লেগুনা ও সিএনজি- অটোরিক্সা থামিয়ে চাঁদা আদায়ে প্রতিবাদ করায় ৪ যাত্রীকে দুর্বৃত্তরা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে ।

সংগঠিত দুর্ঘটনার যানবাহন পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২৯.১৮ শতাংশ বাস, ২৩.৬ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ৬.৬ শতাংশ নছিমন-করিমন, ৫.৯ শতাংশ ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক, ১১.১৫ শতাংশ অটোরিক্সা, ৬.৯ শতাংশ কার-মাইক্রো ও ১৬.৭২ শতাংশ মোটরসাইকেল, ৯.১৬ শতাংশ অনান্য যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।
মোট সংগঠিত দূর্ঘটনার ৩১.৩৮ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৪৪.৩৫ শতাংশ পথচারীকে গাড়ী চাপা দেয়ার ঘটনা, ১৭.৫৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রন হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনা, ১.১০ শতাংশ চলন্ত গাড়ী থেকে পড়ে, ১.২৬ শতাংশ চাকায় উড়না পেছিয়ে ও ৫.০২ শতাংশ অনান্য অজ্ঞাত কারনে দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ১। ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন। ২। বিরতিহীন/বিশ্রামহীন ভাবে যানবাহন চালানো। ৩। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও অদক্ষ চালক- হেলপার দ্বারা যানবাহন চালানো। ৪। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মহাসড়কে অটোরিক্সা, ব্যাটারি চালিত রিক্সা, নসিমন-করিমন ও মোটর সাইকেল অবাধে চলাচল। ৫। বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো। ৬। সড়ক-মহাসড়কে ফুটপাত না থাকা। ৭। সড়ক-মহাসড়কে বেহাল দশা এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
সুপারিশমালা: (১) সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে রোড সেইফটি ইউনিট গঠন করে এই ইউনিট কর্তৃক নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিকারের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। (২) প্রশিক্ষিত চালক গড়ে তোলা জন্য জাতীয় পর্যায়ে সরকারী ভাবে “চালক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র” গড়ে তোলা। (৩) নিয়মিত রাস্তার রোড সেইফটি অডিট করা। (৪) ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধ করা। (৫) ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে মানসম্মত পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা। (৬) মহাসড়কে ধীরগতির যান ও দ্রুত গতির যানের জন্য আলাদা আলাদা লেইনের ব্যবস্থা করা। (৭) মহাসড়কে নছিমন-করিমন, ব্যাটারি চালিত রিক্সা, অটোরিক্সা বন্ধে সরকারের গৃহিত সিদ্ধান্ত শত ভাগ বাস্তবায়ন করা। (৮) ভাঙ্গাছোড়া রাস্তাঘাট মেরামত করা। (৯) ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া । (১০) জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে ফুটপাত, আন্ডারপাস, ওভারপাস তৈরি করে পথচারীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা।
এইসময উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্ঠা ও সেইফ রোড এন্ড ট্রান্সর্পোট এলায়েন্স আহবায়ক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, বিআরটিএ-র সাবেক চেয়্যারম্যান আইয়ুবুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট ব্যারিষ্টার জ্যোর্তিময় বডুয়া , এফবিসিআই সাবেক পরিচালক আব্দুল হক,যাত্রী কল্যান সমিতির কেন্দিয় নেতা এম মনিরুল হক,মহিউদ্দীন আহমেদ, জিয়াউল হক চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.