আমি আব্দুল খালেক বলছি!

 

শাহীন মাহমুদ রাসেল:  কী দমবন্ধকর এই পরিস্থিতি! কত আকুতি-মিনতি করেছি,আমাকে বাঁচতে দাও, আমি এই সমাজ ছেড়ে আদিম যুগের সেই গুহা বেছে নেবো। কি পাষণ্ড তারা! আমার আর্তনাদ ওদের মনে একটুও জায়গা পাইনি। নিশ্চিন্তে মৃত্যুর আঙিনায় পৌঁছানোর জন্যই যেন সযত্নে  গলা টিপে ধরে তারা।একেকটি আঘাত যেন ক্ষত বিক্ষত আমার সেদিনের পুরো পৃথিবী। হয়তো আশপাশের অসহিষ্ণুতা, সেই অসহিষ্ণুতার আঁচ থেকে নিজেকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টাই না করেছি, কাজ হয়নি। আমি বার-বার চিৎকার করে একটি কথা বলেছি, তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে-করতে মৃত্যুর কোলে বড্ড ক্লান্ত হয়ে হেলে পড়েছি, পোকামাকড়ের সাথে যুদ্ধ করার ক্ষমতা আমার নেই! পোকামাকড়ের সাথে যুদ্ধ করতে না পারলে, কবর, শশ্মান কোনটাতেই আমার ঠিকানা হবেনা। আমার লাশটি এইভাবে ছুড়ে ফেলে দিওনা, হয়তো কোন মসজিদের কাছে রেখে এসো, যাতে একটু মুসলিম হিসেবে ধর্মীয় চেতনায় শায়িত হয়! আমার এই আর্তনাদ, ঘাতকরা একটুও করুনা করেনি! হে আল্লাহ তাদের অন্তর কি আগুনের শিখা দিয়ে তৈরী করেছো? আমার জীবনের  মূল্যবোধ বুঝে উঠার আগেই মৃত্যুর কোলে ঘুমিয়ে পড়েছি, মানুষ নামের কতিপয় দুর্বৃত্তের পৈশাচিকতায়। এদের দেখে পশুও লজ্জা পাবে।একটি সভ্য সমাজে এ রকম লোমহর্ষক ঘটনা ঘটাতে পারে? এই যে  বিভৎস চেহারা, সেটা কী এখনও মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে ডিঙ্গাতে পারে নি? আর কত পৈশাচিক হলে, আর কত সংখ্যক খুন হলে মধ্যযুগীয় সেই পৈশাচিকতার  সেই রেকর্ড ভাঙ্গতে পারবে? আমি যখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছি তখন কেমন অনুভূতি হয়েছিলো জানেন? আমি আমার মৃত্যুর যন্ত্রণার বিবরণী দিতে গেলে হয়তো কেউ এই পৃথিবীতে জন্ম নেবার সাহসটুকু হারিয়ে ফেলবে। আমি এই নরপিশাচদের কঠিন শাস্তির দাবি করছি। শুধু আমার হত্যাকারী গুলো নয়, এই নরপিশাচদের মতো যত এই সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমি চিৎকার করে তাদের ফাঁসি কার্যকর দেখতে চাই। এই নরপিশাচরা ধরা পড়েছে। তাদের ছাড়বেন না। ওদের শাস্তি দিন। আমি আর আপনাদের মাঝে কখনো ফিরে আসবনা। কিন্তু চারপাশের হাজারো আমি খালেকের নিরাপত্তার জন্য নরপিশাচদের ফাঁসি দেওয়ার প্রয়োজন আছে।

আমি আমার সমাজকে হত্যাকারিদের হাতে তুলে দিতে চাই না। এই রাষ্ট্র কোনও হত্যাকারিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে পারে না। হতে দিতে পারি না। বিচারপতিরা আপনারা কি মৃত্যুর সময় আমার চিৎকার শুনতে পেয়েছিলেন? কান পেতে শুনুন। ব্যাথায় চিৎকার করছি আমি, চিৎকার করতে করতে কন্ঠনালী গলগল করে রক্তের বন্যা বইতে বইতে গলা বন্ধ হয়ে গেলো চিরতরে। কারণ আঘাতের পর আঘাত করতে করতে শিরা উপ শিরা সমস্তু যন্ত্রণা জলাঞ্জলি দিয়েছে ওই নরপিশাচরা। এই নরপিশাচরা এভাবেই দিনে দিনে আমি খালেকদের মেরে ফেলছে। আমার নিথর দেহ বস্তাবন্দী করে একটি নদীর বুকে ছুড়ে ফেলে দিলো। আমার দেহের সাথে সাথে অসুস্থ সমাজেও পচন ধরেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি সবার কর্তা। আপনার কাছে গেলে কেউ খালি হাতে ফিরে আসে না। আমি জানি না, আপনার কানে আমার এই আহাজারি পৌঁছাবে কিনা। বিশ্বাস করুন, আমি এত অল্প সময়ে এই সুন্দর পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চাইনি। আজ আমি আমার স্বর্গের দুয়ার থেকে কেঁদে কেঁদে জিজ্ঞেস করছি, ‘মা, আমি তো কোনও অপরাধ করিনি। আমি তো তোমার শাসনেই চলার চেষ্টা করেছি মা। আমি তো তুমি যে খাবার এনে দাও, তা খেয়েই বড় হচ্ছিলাম। তবে কেন আমাকে ওরা মেরে ফেললো? কেন আমাকে ওরা ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ছুড়ে ফেলে দিলো? আমি যখন মৃত্যুর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলাম, তোমাদের এত ডাকলাম। কেউ তোমরা শুনলে না। কেন? আমার যে ব্যথা করছিল সেটা কি কেউই বোঝোনি? আমাকে কেন বাঁচার সুযোগটুকু করে দিলে না? আমি তো একটি স্বাধীন দেশেই জন্মেছিলাম। সে দেশে আইন আছে, নিয়ম আছে, বিচার আছে, শাস্তি আছে। পারো না তোমরা আমার হত্যাকারিদের শাস্তি দিতে? ওহ! আমি ছোট বলে আমার জীবনের কোনও দাম নেই, না? আমি জানি আমাকে মেরে ফেলার শাস্তিও হবে না। এর আগে তো পুজা আপুকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিলো শাস্তি এখনও হয়নি। তনু আপাকে মেরে ফেলার শাস্তি তোমরা নিশ্চিত করতে পারোনি। ওই যে কিছু দিন আগেওতো একজনক আইনজীবীকে আমার মতো পরকিয়ার কারণে এভাবেই হত্যা করেছিল, আমার মতো বউয়ের পরকিয়া বলিরপাঠা হয়েছিলো। তার কি কিছু হয়েছে? হয়নি। তবে আমিই বা কেমন করে আশা করি যে আমাকে মেরে ফেলার বিচার হবে? বোকা আমি। করি না। বিচারের আশা করি না মা। কেবল একটা অনুরোধ। এই দেশে যেন আমার মতো আর কোনও খালেককে কেবল বউয়ের কারণে জীবন দিতে না হয়। আর কোনও পুরুষ যেন কোনও অসভ্য বউয়ের পরকীয়া লালসার শিকার না হয়। পারবে না মা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.