চকরিয়ার ১৫ দিনমজুর পরিবার এখন বসত-ভিটে হারা : ওসি’র শাস্তিসহ ক্ষতিপূরণ দাবী

লোহাগাড়া থানায় সাজানো ডাকাতি মামলায় আসামী হয়ে
আবদুল মজিদ:
বেচে থাকার তাগিদে কাজ খোঁজতে গিয়ে কাজের পরিবর্তে চকরিয়ার ১৫ দিনমজুরের ভাগ্যে জুটেছে মিথ্যা অস্ত্রসহ ডাকাতি মামলা। ১৫ জনের মধ্য ১২জনের ভাগ্যে মিলেছে জেলখানার ভাতও। দীর্ঘ ৭মাস কারাভোগের পর ওই ১১ জন উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আসলেও একজন জেলখানায় ও দুজন নিরুদ্দেশ রয়েছে। প্রকৃত ঘটনা জানাজানি হলে সর্বত্র পড়ে যায় হৈ-চৈ। তবে মামলার ঘানি টেনে এরই মধ্যে বসতভিটে বিক্রি করে সর্বশান্ত হয়েছে ওই ১৫টি গরীব ও দিনমজুরের পরিবার। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট লোহাগাড়া থানার ওসি শাহাজাহানকে প্রত্যাহার করা হলেও শাস্তি হয়নি আজও। ক্ষতিগ্রস্ত লোকগুলো সঠিক তদন্তপূর্বক ঘটনার হোতা জুনাইদ চেয়ারম্যান, মেম্বার আলম এবং ওসি মো: শাহ জাহানের শাস্তিসহ ক্ষতিপূরণ দাবী করেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, চকরিয়া উপজেলার ভেওলা মানিকচর ইউনিয়নের ছিদ্দিক আহমদের পুত্র হুমায়ুন কবির(২৫), শাহ আলমের পুত্র সাইফুল ইসলাম প্র: সাদ উল্লাহ (৩৩), কালুমিয়ার পুত্র মিজানুর রহমান মিজান(৩২), নাজিম উদ্দিনের পুত্র শহীদুল ইসলাম(২৫), পূর্ববড়ভেওলা কালাগাজি সিকদার পাড়ার মৃত শামসুল আলমের পুত্র মো: রিদুয়ান(২৪), সৈয়দ আহমদের পুত্র মো: সিরাজুল মনির আরাফাত(২৫), মৃত হাবিবুর রহমানের পুত্র আলী হোসেন(২৫), মোস্তাক আহমদের পুত্র নাছির উদ্দিন (২০), কুতুবউদ্দিনের পুত্র মোশারফ (২২), শামসুল আলমের পুত্র জয়নাল আবেদীন (৩০), আহমদ হোসেনের পুত্র মো: আরাফাত(১৯), জয়নাল আবেদীনের পুত্র সাইফুল ইসলাম(২০), আলী হোসেনের পুত্র মুক্তার আহমদ(২৬),) ফেরদৌস আহমদের পুত্র আরামান(২০) ও পশ্চিম কৈয়ারবিল দ্বিপকুল পাড়ার আনোয়ার হোসেনের পুত্র আলমগীর(২৬)সহ ১৫জন দিনমজুর ১০ আগস্ট ১৭ ইং কাজের খোঁজে গৃহত্যাগ করে কাজের খোঁজে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর বাজারে গিয়ে উঠে। এসময় ওই উপজেলার আধুনগর গ্রামের সর্দানীপাড়ার মোহাম্মদ হারুণ প্রকাশ বডি বিল্ডার হারুণ চকরিয়ার মিজান নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে দৈনিক ৫০০টাকা মজুরী ধার্য করে ধান চারা লাগানোর কাজ করতে বাড়ি নিয়ে যায়। পরদিন থেকে ধানের চারা লাগানোর কথা। কিন্তু রাতের খাবার খেয়ে তারা ঘুমানোর প্রস্তুতিকালে লোহাগাড়ার থানার পুলিশ গিয়ে হারুনের বাড়ি ঘিরে ফেলে। পুলিশ দেখে বাড়ির সবাই পালিয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠতে না পেরে বাড়িতে অবস্থানরত দিনমজুররাও পালিয়ে যায়। পুলিশ তাদের তাড়া করে। এ সময় ১৫ শ্রমিকের মধ্যে থেকে পুলিশ ও বড়হাতিয়া ইউপির চেয়ারম্যান জুনাইদ ও মেম্বার আলমের সহায়তায় ১২ শ্রমিককে আটক করে। বাকী দুজন শহীদুল ইসলাম ও আরমান পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ধৃতদের স্থানীয় বড়হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, বডি বিল্ডার হারুনের প্রতিপক্ষ জুনাইদ চেয়ারম্যান ও মেম্বার আলমের সহযোগিতায় সেখান থেকে পুলিশ ডাকাতি নাটক সাজায়। আটককৃতদের বিরুদ্ধে ডাকাতি প্রস্তুতি ও অস্ত্র আইনে মামলা ( মামলা নং জি আর ৩০৮/১৭) করে কোর্টে চালান দেন ওসি। পরদিন চকরিয়ার বিএমচর ইউপির চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলাম সাংবাদিকদের জানান, আটককৃতরা দিনমজুর, তারা ওখানে কাজের খোঁজেই গেছেন। একইভাবে যার বাড়িতে তারা কাজ করতে অবস্থান করছিল সেই বাড়ির মালিক মো: হারুনও সাংবাদিকদের জানান, আটককৃত সবাই দিনমজুর, তাদের দৈনিক ৫০০ টাকা ধার্য করে ধান রোপনের কাজে আনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ঘটনার ২ মাস আগে লোহাগাড়ার থানার ওসি মো: শাহজাহান ও কয়েকজন এসআইয়ের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও তার ছোভাইকে থানায় নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগে আদালতে ২টি মামলা করেন তিনি। সেই থেকে ওসি তার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং এর ধারাবাহিকতায় তাকে ফাঁসানোর জন্য তার সাথে জমিজমার বিরোধ রয়েছে এমন ব্যক্তি স্থানীয় চেয়ারম্যান জুনাইদ ও মেম্বার আলমকে নিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। মাত্র একজনকে ফাঁসাতে ২১ ব্যক্তির জীবন দূর্বিষহ করে তোলেন ওসি শাহ জাহান। এ দিকে প্রকৃত ঘটনা ফাঁস হলে তুলপাড় চলে সর্বত্র। চলতি বছরের ১৩ ফেব্রæয়ারি ওসি মো: শাহজাহানকে লোহাগাড়া থানা থেকে উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রত্যাহার করা হয়। অন্যদিকে দীর্ঘ ৭ মাস কারা ভোগের পর ধৃত ১২ জনের ১১ জন উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়েছেন ৩ এপ্রিল। জেল থেকে আসা দিনমজুর হুমায়ুন কবির কান্না বিজড়িত কন্ঠে বলেন, কাজের খোঁেজ গিয়ে পেলাম ডাকাতি ও অস্ত্র মামলা, এ মামলা থেকে জামিন পেতে গিয়ে বিক্রি করেছে বসত-ভিটে, থাকি এখন ভাড়া বাসায়। অপরাপর আসামীরাও বলেন একই কথা, কেউ বসত-ভিটে ঘরসহ পুরো বিক্রি করেছেন, কেউ অর্ধেক বিক্রি করেছেন। আবার কেউ সহায়-সম্পদক না থাকায় প্রচুর ধার-কর্জে ডুবেছেন। বর্তমানে খেয়ে না খেয়ে দিনপার করছে এসব পরিবার, চলছে নীরব কান্না। শনিবার বিকেলে চকরিয়া প্রেসক্লাবে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে এসে মর্মস্পর্শী ঘটনার কথা বলেন তারা। তারা দাবী করেন, ওসি মো: শাহ জাহানকে থানা থেকে প্রত্যাহার করলে হবেনা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক তার শাস্তিও হতে হবে। পাশাপাশি মিথ্যা মামলায় ফাঁিসয়ে জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলায় সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণেরও দাবী করেন নির্যাতিত এসব লোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.