ইউরোপের ভিসা ফিরিয়ে দিয়ে মাছ প্রাণীর সাথে বসবাস এরশাদ মাহমুদের


চট্টগ্রাম : ‘সবার প্রতি অনুরোধ, আপনারা সুন্দর লক্ষ্য ঠিক করে অগ্রসর হবেন। সফল হবেনই। কেউ লেখাপড়া করে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার হতে চাইলে ছোট থেকে স্থির করতে হবে। সে হিসেবে প্রস্তুতিপর্ব চালিয়ে যেতে হবে।’ এভাবেই বলছিলেন ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক চ্যানেল আই অ্যাগ্রো অ্যাওয়ার্ড ২০২০’ বিজয়ী এরশাদ মাহমুদ।

‘পরিবর্তনের নায়ক’ ক্যাটাগরিতে ‘অ্যাগ্রো অ্যাওয়ার্ড’ পাওয়ায় শনিবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুরে ইডেন ইংলিশ স্কুলের পক্ষ থেকে রাঙ্গুনিয়ার সফল খামার উদ্যোক্তা এরশাদ মাহমুদকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, এতে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

তৃণভোজী বন্যপ্রাণি গয়ালকে গৃহপালিত প্রাণীতে পরিণত করায় জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পাওয়া এরশাদ মাহমুদ নিজের উঠে আসার গল্প বলেন অনুষ্ঠানে। তিনি বলেন, আমার ভাইয়েরা কেউ রাজনীতি করে, কেউ ব্যবসা করে। চিন্তা করলাম, আমার তো আর রাজনীতি করে বাংলাদেশে পরিচিতি পাওয়া সম্ভব না। তাহলে আমি কী করবো? লেখাপড়া শেষে চাকরি-বাকরি না খুঁজে গ্রামে চলে আসলাম।

‘এর মধ্যে বাবা ও বড় ভাই অনেক চেষ্টা করেছেন আমাকে ইউরোপে নেওয়ার জন্য। ইউরোপে যাওয়ার জন্য ভিসা হয়েছিল, টিকিটও হয়েছিল। কিন্তু আমি রিফিউজ করেছি। আমি তখন চিন্তা করতাম, জীবনযুদ্ধে পরাজিত সৈনিকরাই বিদেশে যান। এটা আমার মতামত, আপনাদের সাথে না-ও মিলতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এটাই মনে হয়। তাই বিদেশ আমার যাওয়া হয়নি। বেশি লেখাপড়াও হয়নি। তখন আমি স্থির করলাম, গ্রামে গিয়ে কিছু একটা করবো। গরিব মেহনতি মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করবো এবং মা, মাটি, মানুষ নিয়ে থাকবো। এর মধ্য দিয়ে আমি পরিচিত হবো।’

স্মৃতিচারণ করে এরশাদ মাহমুদ বলেন, প্রথমে আমি মৎস্যচাষ ও বৃক্ষরোপণ আরম্ভ করলাম। একপর্যায়ে আমি সফল হতে লাগলাম। আমার প্রতি মানুষের আগ্রহও বাড়তে লাগলো। আমার মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হতে শুরু করলো। একপর্যায়ে আমি ছোট একটা অ্যাওয়ার্ডও পেয়ে গেলাম। তারপর উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। এরপর চিন্তা করলাম, জাতীয়ভাবে দেশকে কিছু কীভাবে দিতে পারি, দেশের উন্নতি কীভাবে করতে পারি, কর্মসংস্থান কীভাবে বৃদ্ধি করতে পারি, সেই চিন্তা থেকেই, সেই লক্ষ্য নিয়েই আমি পথচলা শুরু করলাম। একপর্যায়ে আমি লক্ষে পৌঁছে গেলাম। আমি জাতীয়ভাবে পৃরস্কৃত হলাম। আমার স্পিড আরও বেড়ে গেল।

গয়ালের বিষয়ে এরশাদ মাহমুদ বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে গয়ালের প্রতি আমার দুর্বলতা। প্রাণীটি দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল। চিন্তা করলাম, এই প্রাণীটির উৎপাদন যদি প্রচুর পরিমাণে বাড়িয়ে দেওয়া যেত, তাহলে গয়ালের বিলুপ্তি থেকে দেশকে রক্ষা করা যেত। আমিও লাভবান হতে পারতাম। লক্ষ্য ঠিক করে কাজে নেমে আমি সফল হয়েছি।’

‘সবকিছু তো একসময় গৃহপালিত ছিল না, গৃহপালিত হয়েছে। গয়ালও গৃহপালিত ছিল না। গয়ালকে গৃহপালিত করতে আমি দিনরাত পরিশ্রম করেছি, আমি সফল হয়েছি। আমি ১২টি বছর গয়ালের পেছনে দিয়েছি।’

মাছচাষ ও বৃক্ষরোপণের পেছনে ৩ যুগ পড়ে ছিলেন জানিয়ে এরশাদ মাহমুদ বলেন, আমার জীবনের মূল্যবান সময়টি গাছ, মাছ, গরু, ছাগল, গয়ালের পেছনে দিয়েছি। মেহনতি মানুষের পাশে থেকেছি।

সংবর্ধনা দিয়ে সম্মানিত করার জন্য ইডেন ইংলিশ স্কুল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান সফল খামার উদ্যোক্তা এরশাদ মাহমুদ।

অনুষ্ঠানে সুখবিলাস ফিশারিজ অ্যান্ড প্ল্যান্টেশনের কো চেয়ারম্যান শাকিলা আক্তারকেও সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

বক্তব্য রাখেন ইডেন ইংলিশ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা খালেদ মাহমুদ ও স্কুলের প্রিন্সিপাল মাহনুমা তাসনিম।

প্রসঙ্গত, তৃণভোজী বন্যপ্রাণি গয়ালকে আগে কেউ বশে আনতে পারেননি। এমনকি সরকার ১১ কোটি টাকা খরচ করে গয়ালের প্রজনন কেন্দ্র করেছিল, সেটিও ধ্বংস হয়ে গেছে।

কিন্তু গয়ালকে বশে আনার কাজটি সফলভাবে করতে সক্ষম হয়েছেন এরশাদ মাহমুদ। ১২ বছর ধরে রাঙ্গুনিয়া-বান্দরবান সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায় গয়ালের খামার করছেন তিনি। শুধু লালন পালন নয়, গরুর স্থানীয় জাতের সঙ্গে গয়ালের শংকরায়নও করেছেন তিনি। গয়ালের জাত উন্নয়নের জন্য তিনি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় গয়ালের ১৫টি খামার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কৌশল শিখিয়েছেন, সহায়তা দিয়েছেন সফল খামারী এরশাদ মাহমুদ। এতে গয়ালের খামারী বৃদ্ধি পেয়েছে।

এসব দিক বিবেচনায় ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক চ্যানেল আই অ্যাগ্রো অ্যাওয়ার্ড ২০২০’ পেয়েছেন প্রকৃতিপ্রেমী এরশাদ মাহমুদ।

চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাই স্কুল থেকে ১৯৮০ সালে এসএসসি, হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজ থেকে এইচএসসি এবং রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাশ করা এরশাদ মাহমুদ রাঙ্গুনিয়ায় একে একে গড়ে তুলেছেন বনায়ন, মৎস্যপ্রকল্প, গরু-মহিষ-গয়াল ও ছাগলের খামার।

এরশাদ মাহমুদ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপির ছোটভাই। তার প্রয়াত পিতা অ্যাডভোকেট নুরুচ্ছফা তালুকদার চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও একাধিকবার পাবলিক প্রসিকিউটর ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.