শিক্ষানবিস আইনজীবী জাহেদের আইন বিষয়ে গুরুত্ববহ লিখুনি

বাংলাদেশ সংবিধান-১৯৭২ এর ২৭ নং অনুচ্ছেদে বলা আছে, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান নাগরিক এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার তাঁর আছে। সুতরাং সে যত বড় অপরাধের সাথে জড়িত হোক না কেন তাকে একজন আইজীবীর মাধ্যমে আদালতে আত্মরক্ষার অধিকার পরিচর্চা করার সুযোগ দিতে হবে।এখানে ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ বলতে নিজেকে কৃত অপরাধ থেকে একুইটাল বা বেখসুর খালাস নেওয়াটা না বুঝিয়ে সে যতটুকু অপরাধ করেছে তার চেয়ে যেন বেশি শাস্তি যেন না পায় সেটা নিশ্চায়ন করাটাও বুঝায়।

সংবিধানের ৩৩(১) উপ অনুচ্ছেদেও বলা আছে একজন আসামী কিংবা অভিযুক্তের অধিকার আছে তার পক্ষে একজন আইনজীবী মনোনিত করার৷ এবং এটা তার সাংবিধানিক অধিকার। ধর্ষকের পক্ষে আইনজীবী না দাঁড়ানোর যে দাবি তাহা সংবিধান অবমাননা অথবা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক মন্তব্য।

ধর্ষণ বা জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে দাঁড়ানো আইনজীবীদের যারা বাজে বা বিশ্রি ভাষায় অথবা যারা গঠনমূলক সমালোচনা করছেন তাদের বলি,আইনজীবীরা আমি -আপনার কথায় চলে না৷ আইনজীবীদের পরিচালনার জন্য এবং তাদের পেশাগত কর্মের গতিবিধি ঠিক রাখার জন্য তাদের সতন্ত্র নিয়ন্ত্রক বডি আছে যেটা The Bangladesh legal practitioners and Bar council order and rules,1972 নামে পরিচিত। আবার সেখানে Canons of professional conduct and Etiquette-ও আছে যা দিয়ে আইনজীবীদের পেশাগত আচরণের গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানে Canons and professional conduct and etiquette এর চ্যাপ্টার ২ এবং ৯ তে স্পষ্ট বলা আছে,অপরাধী যেই হোক তাকে আইনগত সহায়তা দিতে একজন আইনজীবীর কোনো বাধা নেই।

আবার একজন ঘৃণ্য অপরাধীর পক্ষে হয়েও আইনী লড়ায় করার মানে হল,তাকে বেখসুর খালাস এনে দেওয়াও নয় বরং তাকে তার উপযুক্ত শাস্তির বেশি শাস্তি যাতে না হয় সেটাই নিশ্চিত করা নয় কি??

ধরুন,আপনি একজন আত্মস্বীকৃত অপরাধীর পক্ষে ওকালতি করার জন্য প্রযুক্ত হলে তার মানে কি তার পক্ষে সত্যমিথ্যা যাচাই-বাছাই না করে ঢ়ালাওভাবে বক্তব্য দিবেন?? যেখানে একজন আইনজীবীর কাজই হল আদালতকে সহযোগিতা করা যাতে আদালত সঠিক বিচার করতে বিচলিতবোধ মনে না করে।এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্টা করতে সহযোগিতার করায় হল আইনজীবীর কাজ।

আবার একজন ঘৃণ্য-জঘন্য বা আত্মস্বীকৃত আসামীর ক্ষেত্রে যেমন আইনজীবী নিয়োগ বা প্রযুক্ত করার আধিকার আছে ঠিক তেমনি “Conduct with regard to the public” অনুযায়ী সেই মামলাগুলোতে আইনজীবী হিসেবে প্রযুক্ত বা নিয়োগ না নেয়ার অধিকারও আইনজীবীদের আছে।অনেকেই জানতে চান, তাহলে জঙ্গীরা কেন ওকিল পায় না, তারা ওকিল পায় না বা ওকিল তাদের পক্ষে আইনী লড়াই করে না সেটা Above mentioned নিয়মের হেতুতে। কারণ আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক বডিতেই আছে, কোনো আইনজীবী যদি কোনো মামলা নিতে না চান তাহলে সেই আইনজীবীকে আপনি বাধ্য করতে পারবেন না৷ তার পেশা পছন্দের অধিকারও তার আছে।

যতই বলেন না কেন উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনেই আপনাকে জাজমেন্ট দিতে হবে, এছাড়া এটাকে ন্যায়বিচার বলাটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। এই বক্ত্যবই ধোপে টিকে। সেটা ধর্ষণের মামলা হোক আর খুনের মামলা হোক৷

এবার আসুন উভয়ের বক্তব্য শুনতে ইসলাম কি বলে। ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় বাদী-বিবাদী উভয়ের কথা শ্রবণ করার পর বিচারক ফায়ছালা দিবেন। এক পক্ষের বক্তব্যের উপর নির্ভর করে রায় প্রদান করতে শরী‘আতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِذَا تَقَاضَى إِلَيْكَ رَجُلاَنِ فَلاَ تَقْضِ لِلأَوَّلِ حَتَّى تَسْمَعَ كَلاَمَ الآخَرِ فَسَوْفَ تَدْرِى كَيْفَ تَقْضِى- ‘তোমার নিকট যখন দু’জন লোক বিচারের জন্য আবেদন করে, তখন তুমি দ্বিতীয় পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে না শুনেই প্রথম পক্ষের কথার উপর ভিত্তি করে রায় প্রদান করবে না। তুমি খুব শীঘ্রই জানতে পারবে, তুমি কিভাবে ফায়ছালা করেছ’।[2] তিনি আরো বলেন,إِذَا جَلَسَ إِلَيْكَ الْخَصْمَانِ فَلاَ تَقْضِ بَيْنَهُمَا حَتَّى تَسْمَعَ مِنَ الآخَرِ كَمَا سَمِعْتَ مِنَ الأَوَّلِ فَإِنَّكَ إِذَا فَعَلْتَ ذَلِكَ تَبَيَّنَ لَكَ الْقَضَاءُ ‘তোমার নিকট যখন দু’জন লোক বিচারের জন্য বসে, তখন তুমি তাদের মাঝে ফায়ছালা করবে না, যতক্ষণ না দ্বিতীয় পক্ষের বক্তব্য শুনবে যেভাবে তুমি প্রথম পক্ষের কথা শুনেছ। যখন তুমি এরূপ করবে, তখন তোমার কাছে ফায়ছালার বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে’।

ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় বিচারক যেন কোন অবস্থাতেই কোন পক্ষের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করে বিচার কার্য পরিচালনা না করে সে বিষয়ে আল-কুরআনে কঠোর হুঁশিয়ারী ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللهَ إِنَّ اللهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ- ‘কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর, যা আল্লাহভীতির অধিকতর নিকটবর্তী। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সকল কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত’ (মায়েদাহ ৫/৮)।

মতামতঃ আমার মতে অপরাধীদের ক্ষেত্রে আইনজীবী না দাঁড়ানো এটারে সমর্থন করা যায় না, কারণ এতে করে মানুষ ম্যালাফাইডলি বা দুরভিসন্ধিমূলক বা হয়রানিভাবে মিথ্যা মামলায় ফেঁসে গেলে তাকে আজীবন কারাবরণ বৈকি উপায় নাই।কারণ ওকিল নাই, তাহলে কে কারামুক্ত করবে আপনাকে??বুঝেন কিছু??কেননা এই দেশের মানুষ তো ভাল না৷ এইদেশে এখনো ইথিকসের ঘাটতি আছে৷ রাজনৈতিকভাবে বা ব্যক্তিগতভাবে শত্রু হলেই ধর্ষণ মামলায় ফাঁসাইলে কি-ই বা করবেন আপনি??সুতরাং আন্দোলনকারী কতৃক ধর্ষকের বিরুদ্ধে আইনজীবীদের প্রতি আইনী লড়ায় না করার আহবান,এটা এমনকি তাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও বুমেরাং কিংবা হিতে বিপরীত হবে, এতে সন্দেহ মোটেও নাই। সুতরাং সাধু সাবধান !

আর ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড করার বিধান করতে যারা বলছেন,তাদের কাছে আমার প্রশ্ন,শাস্তি বাড়ালেই অপরাধ কমবে এমন কোনো গ্যারান্টি আছে????আমি আমার কারাগারের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি, বর্তমানে কারাগারের নাম সরকারিভাবে কারাগার না বলে সংশোধনাগার বলার বিধান চালু হয়ছে। কিন্তু কতজন আছে যারা কারাগারে গিয়ে সংশোধিত হয়ছে??কারাগারের সার্বিক পরিস্থিতির আলোকেই বলি,ওখান থেকে মানুষ সংশোধিত না হয়ে বরং বড় বড় টেরর হয়েই বের হয়। এমনকি আমি এমন মানুষকেও দেখছি যারা বিনা অপরাধে জেলে গেছেন বা লঘু পাপে গুরুদন্ড পেয়েছে তারা এটাই মনস্থিরই করেন যে,বের হয়েই তার দোষমনকে জানে মেরে পেলবে বা বড় মাপের ক্ষতিই করবে,এইবার বলেন, শাস্তি বা কারাগারে দিলে অপরাধ কমবে নাকি বাড়বে??

অবশ্যই অপরাধ বিজ্ঞানে, “pain and pleasure” নামীয় একটা মতবাদ আছে৷ অর্থাৎ শাস্তি বেশি হলে অপরাধ কমে। আমি মনে করি,এটা প্রতিষ্টিত কোনো নীতি নয়। তারচেয়ে বরং অপরাধ বিজ্ঞান অনুযায়ী চার প্রকার শাস্তির মধ্যে “Reformation theory” নামক যে মতবাদটা আছে সেটা প্রয়োগ করলেই অপরাধ কমবে। এই তত্তের নির্যাস হল,অপরাধীকে সংস্কারের আওতায় আনা হোক। তাকে শিক্ষা-দিক্ষা বা সামাজিক কাজ-কর্মে অংশগ্রহণ করিয়ে বুঝানো হোক যাতে,তার কৃত কর্মটি না করাই ভালো অথবা সেই কাজটা অপরাধ যাহা সমাজ আর রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা তৈয়ার করে। মনে রাখা দরকার, মানুষ অপরাধী হয়েই জন্মায় না, সে পারিপার্শ্বিক কারণেই অপরাধী হয়ে ওঠে। কথায় আছে,সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে,তাই না??আর মানুষকে বেশি বেশি করে ধর্মীয় আর ইথিক্যাল নলেজে উদ্বুদ্ধ করা হউক, এটাও অপরাধ নিরসনে প্রায়োগিকভাবে কাজে দিবে।

সর্বশেষ একটা কথা বলি,চলুন,জোরের যুক্তিতে নয় বরং যুক্তির জোরেই অপরাধ বিনাশ করে সুন্দর আর সুবোধের সমাজ বিনির্মাণে কাজ করি।

জাহিদ হৃদয়
শিক্ষানবিশ আইনজীবী,
চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ্ কোর্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.