অনলাইন সাংবাদিকতা : নীতি-নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব

 প্রযুক্তির অগ্রগতি, উন্নয়ন, বিকাশ ও বিস্তার গণমাধ্যমকে ভিন্নমাত্রা এনে দিয়েছে। অনলাইন সাংবাদিকতা সেই পথ ধরেই বিকাশ লাভ করছে। ফলে এ পেশায়ও ভিন্নমাত্রা ও বৈশিষ্ট্য যোগ হয়েছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অনলাইন সাংবাদিকতা কেবল হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগুচ্ছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন সাংবাদিকতার মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। বলা যায়, অমিলের চেয়ে মিলের মাত্রাই বেশি। তবে উপস্থাপন, প্রচার-প্রকাশ করার আলাদা আলাদা ধরণ ও বৈশিষ্ট্য এবং বৈচিত্র রয়েছে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর পাঠকের কাছে একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষার পর পৌঁছে। এই অপেক্ষা কয়েক ঘন্টা, দিন, সপ্তাহ, অর্ধ মাস, মাস বা এর অধিক সময় কাল পর্যন্ত হতে পারে। প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে এদিক থেকে অনেক এগিয়ে টেলিভিশন ও অনলাইন সাংবাদিকতা। যখনকার ঘটনা তখনই সরাসরি সম্প্রচার করার সুবিধা রয়েছে এগুলোর। আজ যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে; সময় গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তার গুরুত্ব কমতে থাকে। যে একবার কোন সংবাদ পড়েন বা দেখেন পরে তা পঁচা মাছের মতই কম গুরুত্বের বা কম মূল্যের হয়ে পড়ে তাঁর কাছে। এ কারণে প্রিন্ট মিডিয়াও এই যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে অনলাইন সংস্করণ করার দিকে মনোযোগি হয়ে উঠেছে। তাই সার্বিক বিবেচনায় অনলাইন সাংবাদিকতা বর্তমান সময়ের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও গরুত্বপূর্ণ পেশা।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে কোন সংবাদ বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমের জুড়ি নেই। এই ব্যবস্থা কখনও কখনও অসুস্থ প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে সাংবাদিকতার মত দায়িত্বশীল চ্যালেঞ্জিং পেশাকে। কে কার আগে কোন সংবাদ প্রচার-প্রকাশ করবে, হৈ রৈ ফেলে দেবে বা কৃতিত্ব নেবে-এই প্রতিযোগিতার নেতিবাচক দিক হচ্ছে-কোন সংবাদের তথ্য যাচাইয়ের সময় কম থাকে। একাধিক উৎস থেকে তথ্য ছাকুনি দিয়ে ছেঁকে সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করার পথ এতে সংকোচিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশেনের চর্চা এক বৈরী সময়ের ভেতর দিয়ে চলছে।

এজন্য ভুল তথ্য বা সংবাদ প্রকাশের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। কিন্ত কোন যুক্তিতেই তা সমর্থন ও গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ব স্বীকৃত জনকল্যাণমুখি প্রতিষ্ঠান গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীর কোন ভুল তথ্য প্রচারের কারণে লঙ্কাকান্ড ঘটে যেতে পারে। গোটা দেশ, জাতি বা বিশ্ব ভয়াবহ ক্ষতি ও বিপর্যয়ের সম্মূখিন হতে পারে এ কারণে। এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে গণমাধ্যম কর্মীদের নীতি-নৈতিকতা ও দায়িত্বশীল পেশাদারী ভূমিকাই পারে আমাদের রক্ষা করতে।

‘কাউকে কোন ভুল তথ্য দেওয়া হলে তা ওই ব্যক্তির মনে নিশ্চিতভাবে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে’- এক সাক্ষাৎকারে মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক শামীম এফ করিম একথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘যখন আমরা কোন ভুল তথ্য পাই তখন তা সঠিক না হওয়া সত্তে¡ও সেই তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা আমাদের বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করি।’

কিছু কিছু মহল, বিশেষ করে ২০১২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারের হত্যাকান্ডের পর অনলাইনে অপপ্রচার চালিয়ে হত্যাকান্ডের পক্ষে জনমত গঠনের প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। শাহবাগ আন্দোলনকে ইসলাম বিরোধী আখ্যায়িত করে এর বিরুদ্ধেও অপপ্রচার চালায়।

ইতোমধ্যে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে, কিভাবে রাজীবের নামে ইসলাম বিরোধী নানা বক্তব্য দিয়ে তৈরি করা একটি ভুয়া ব্লগ প্রচার করা হয়েছে। যা কিছু ডানপন্থী সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হয়। এবং তা মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও উগ্রবাদীদের জন্য উস্কানি হিসেবে কাজ করে। ফলে দেশব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ১৯৯৩ (২০০২ সালে সংশোধিত) সালের আচরণ বিধি উল্লেখ করে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি প্রয়াত বি. কে. দাস বলেন, ‘গুজব বা কোন অনিশ্চিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন প্রকাশ না করে অবশ্যই তা যাচাই করে প্রকাশ করতে হবে। পাঠককে প্রভাবিত করার জন্য কোন ঘটনাকে বিকৃত করা যাবে না।’

২০১২ সালে যখন সরকার নতুন করে আর কোন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তখন অনলাইনে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ভুয়া ছবি ও বিভ্রান্তিকর ক্যাপশন দিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করা হয়। কক্সবাজারের কিছু স্থানীয় সংবাদপত্র এধরণের কিছু ভুয়া ছবি প্রকাশ করে যা স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে উত্তেজনা ও বিভ্রান্তি তৈরি করে।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও ওয়েবসাইটগুলোর যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকাও রয়েছে। এ মাধ্যমটি বিশ্বের প্রত্যেক ব্যক্তিকেই তার মত প্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।

তবে কক্সবাজারের রামুসহ আরো কিছু এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মালম্বী সম্প্রদায়ের ওপর মর্মান্তিক হামলার ঘটনার মত প্রকাশের এমন স্বাধীনতার সুযোগের অপব্যবহার করে দেশে বা সমাজে অশান্তি সৃষ্টি ও ধ্বংসলীলা পরিচালনার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। যে কেউ অনলাইনে পোস্ট করা যে কোন ছবির প্রকৃত উৎস খুঁজে পেতে পারেন Gophoto.it এর মত অ্যাপস্ বা টুলস্ ব্যবহার করে।

যখন জালিয়াতি করা একটি ছবি কেউ পোস্ট করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তখন কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার অন্য ব্যবহারকারীরা তা দেখেন এবং শেয়ারও করেন। যা গাণিতিক হার থেকে ছড়িয়ে পড়ে জ্যামিতিক হারে। একইভাবে ব্যবহারকারীদের মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত হয় অসত্য তথ্যের সমর্থনে বা অসমর্থনে।

মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক শামীম এ ধরণের চর্চার প্রসঙ্গে বলেন, “এ ধরণের সমস্যার সমাধান কী হতে পারে তা আমার জানা নেই। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, আমি চাই না এধরণের কোন ভুল তথ্য প্রকশিত হউক।”

‘অনলাইন সাংবাদিকতায় নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের বিষয়ে লেখার এ পর্যায়ে জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতার প্রতি গুরুত্ব দিতে হয়। তা করতে গিয়ে নীতি নৈতিকতার ওপরই অধিক গুরুত্ব দিতে হয়।

‘নৈতিকতা’ একটি আদর্শিক মানদণ্ড। এই মানদণ্ড ভাল-মন্দ, করণীয়-বর্জনীয়,উচিত-অনুচিত, ঠিক-বেঠিক, ন্যায্য-অন্যায্য, মানবীয়-দানবীয় প্রভৃতির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে দেয়। নৈতিকতা ব্যক্তিকে তাঁর সততা, স্বচ্ছতা, দায়িত্ববোধ এবং অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ধর্ম, সমাজ-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, মানবিকতা ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে নৈতিকতা বা নৈতিক মানদণ্ড গড়ে ওঠে। অর্থাৎ নৈতিকতা বা নৈতিক দর্শন সঠিক কাজের দিশা দেয়।

প্রাণী জগতে একমাত্র মানুষেরই নৈতিক দায় রয়েছে। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবক্ষেত্রেই নৈতিকতা অপরিহার্য। পেশাও এর অন্তর্ভুক্ত। সাংবাদিকতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ জনহিতকর পেশা। সমাজ, সভ্যতা ও মানুষের কল্যাণে এই পেশায় নৈতিকতার শতভাগ চর্চা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে নৈতিকতা বলতে মূলত পেশাগত সততা, স্বচ্ছতা, বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা, ন্যায্যতা, শুদ্ধতা প্রভৃতিকে বোঝায়।

কিন্তু সাংবাদিকতায় অল্প-অর্ধ শিক্ষিত, অনভিজ্ঞ, অদক্ষ, অসৎ সুবিধাবাদী শ্রেণির কতিপয় ব্যক্তির অনুপ্রবেশ ঘটার কারণে সৎ সাংবাদিকতা নেতিবাচক বৈরী পরিবেশ মোকাবেলার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়া বিপথগামী গণমাধ্যমকর্মীর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার কাজটি এখনই গুরুত্বের সাথে শুরু হওয়া দরকার। কেননা দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই মানবকল্যাণের পরিপন্থী বিষয়টির লাগাম টেনে না ধরতে পারলে ক্রমেই তা ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে ওঠবে।

১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাবে তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভায় যে ভাষণ দেন তা এক মহামূল্যবান দলিল। এই ভাষণ সম্পর্কে “বঙ্গবন্ধুর ভাষণ: একটি পর্যালোচনা” শিরোনামে ‘বঙ্গবন্ধু ও গণমাধ্যম’- গ্রন্থে প্রকাশিত মিজানুর রহমান তাঁর লেখা নিবন্ধে যে সমাপ্তি বিশ্লেষণ করেছেন তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

তিনি ওই নিবন্ধের শেষ অনুচ্ছেদে লিখেছেন,“ পুরো বক্তব্য (বঙ্গবন্ধুর ভাষণ) বিশ্লেষণে এটা প্রতীয়মান হয় যে, ওই সময়ের নেতিবাচক সাংবাদিকতা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি নতুন দেশের জন্য কল্যাণকর নয়- এবক্তব্যই ফুটে উঠেছে। বস্তুত হলুদ সাংবাদিকতা কিংবা সাবজেক্টিভ জার্নালিজম কোন সময়ের জন্যই দেশের এবং দশের জন্য উপকারী নয়। এ সত্যটি বঙ্গবন্ধু যেমন বুঝেছিলেন, বর্তমানেও সাংবাদিক সমাজ এবং পাঠককে নৈর্ব্যক্তিক অনুভূতি নিয়ে উপলব্ধি করতে হবে।”

সাংবাদিকতার বিষয়ে আলোচ্য সমস্যার প্রেক্ষাপটে যে যুক্তি বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে উঠে আসে তা হলো- “পেশাজীবিরা যদি নীতিবান হন, তাহলে নীতিমালা বা আচরণবিধি দিয়ে সততার ব্র্যাকেটে বন্দী করার কৌশল খোঁজার দরকার হয় না। আরেক ধাপ এগিয়ে অন্যরা বলেন, এত কিছুর দরকার নেই। একটা সাদামাটা নৈতিক বিষয়ই যথেষ্ট। আর তা হলো-ভালো উদ্দেশ্য।

অন্ধকার টানেলের শেষপ্রান্তে একবিন্দু আলোর মত দার্শনিক প্লেটোও আমাদের জন্য এটা যুক্তি উপহার রেখে গেছেন। এই লেখার উপসংহার টানা যায় সেই যুক্তির উল্লেখ দিয়েই। ‘ভালো মানুষের আইনের দরকার পড়ে না। আর খারাপ মানুষ আইনের মধ্যেও ফাঁকফোঁকর খোঁজে’।

(তথ্য সহায়ক: বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের গণমাধ্যম সাময়িকী ‘নিরীক্ষা’ ২০২তম ও ২০৮ তম সংখ্যা ও ‘বঙ্গবন্ধু ও গণমাধ্যম’ গ্রন্থ।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.