করোনা সংকট নিয়ে সরল আলোচনা!

করোনা বিপর্যয়ের চূড়ান্ত হিসেব নিয়ে এখনো কারো কোন মাথাব্যাথা নেই। কর্তৃপক্ষ কিছুটা এ নিয়ে ভাবলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে নেই কোন দূরদর্শী চিন্তা এবং চেতনা। সাধারণ মানুষ দেশের অগ্রগতি এবং সম-সাময়িক সংকট মোকাবেলায় করণীয় কি সেটা নিয়ে না ভাবলেও সুশীল সমাজ এবং সুনাগরিকগণ করোনা সংকট নিয়ে নানানমুখী মতামত দিচ্ছে।

এ নিয়ে বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে যে বিষয় দুটি নিয়ে সবচেয়ে বেশী আলোচনা হচ্ছে তা হচ্ছে গার্মেন্টস এবং শপিং মল নিয়ে। সরকার, গার্মেন্টসগুলো খোলার অনুমতি এবং শপিং মলগুলো সীমিত সময়ের জন্য খোলা রাখতে পারবে বলে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে বিতর্কের জন্ম নেয় এবং বিতর্কের জন্ম নেওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। যেহেতু, করোনা পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি সেহেতু লকডাউন উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিপক্ষে জনমত তৈরী হবে সেটা স্বাভাবিক। অনেকে মনে করছে রাষ্ট্রচালকের এ বিষয়ে কোন রকম মাথাব্যথা নেই। এমন মন্তব্য ভিত্তিহীন বলা যায়।

আপাত দৃষ্টিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল কাজ হলো দেশের মানুষকে শান্তি এবং নিরাপদে রাখা। আর সে শান্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হলো মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে মুক্তি দেওয়া। অর্থনৈতিক মুক্তি ব্যতীত শান্তি অনিশ্চিত। কাজেই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় সরকার অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধ করার চেষ্টা করছে। আর অর্থনীতির চাকা সচল না হলে দেশের উন্নয়ন এবং অগ্রগতি ধ্বংস হয়ে যাবে সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেব অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতিতে এখন সেবা খাতের অবদান প্রায় ৫০ শতাংশ। এছাড়া শিল্পখাত ৩৫ শতাংশ এবং কৃষির অবদান এখন ১৪ শতাংশের মতো। কাজেই দেশের মেরুদণ্ড সোজা রাখতে গেলে শিল্প -সেবা – কৃষি খাতগুলোকে উপেক্ষা করা যাবে না। সরকার সেদিক বিবেচনা করে বোধহয় শিল্প- কৃষি খাতে লকডাউন অবস্থা শীতল করেছে।

তবে অর্থনীতিকে বাঁচাতে গিয়ে করোনা যেন বৃহৎ আকার ধারণ করতে না পারে সেদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের সুনজর রাখতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। প্রশাসন অবশ্যই করোনা সংকট মোকাবেলায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সচেতন নয়। যার ফলপ্রসূতে তাঁরা প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে যেখানে ইচ্ছে ছুটছে, যা ইচ্ছে করছে। এটা আমাদের নিজেদের জন্য আত্মঘাতী বলা যায়। কাজেই সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে বিপর্যয় আরো ত্বরান্বিত হবে।

তবে গরিব-দুঃখী, অসহায় মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে না পারলে ঘর থেকে জীবিকার তাগিদে বের হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী। তাই সরকার তাদের জন্য যে ত্রাণ এবং প্রণোদনা সহায়তা প্রদান করছে সে সব ত্রাণ এবং প্রণোদনার সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা অতীব প্রয়োজন। এখানে রক্ষক যেন ভক্ষক না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

আবার, করোনা সংকট মোকাবেলার অংশ হিসেবে ধর্মীয় নিয়ম অনুসরণ করে মসজিদ – মন্দিরে সীমিত মানুষ নিয়ে নামাজ কিংবা প্রার্থনা করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু দেখা যায় পরবর্তী সময়ে এমন নির্দেশনা সাধারণ মানুষ তোয়াক্কা করেনি। সেদিন থেকে আজ অবধি মসজিদে জামায়েত দেখার মতন। সরকার কি এসব দেখে না? দেখে! তারপরও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আসতে পারে, এমন চিন্তা করে তড়িৎ প্রদক্ষেপ নেয়নি, আর নিবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এরপরও মসজিদ- মন্দির খোলে দেওয়ার ব্যাপারে কিছু মহল দাবি রাখছে। অথচ মসজিদ- মন্দির একটাও বন্ধ নেই। কাজেই আমাদের যৌক্তিক আলোচনা করা দরকার। আবেগপ্রবণ হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সেখানে আত্মঘাতী ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

করোনা সংকট মোকাবেলায় অগ্রভাগে চিকিৎসকগণ নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে তাঁদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিয়ে নানান অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছে। কাজেই স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত হবে সংকট মোকাবেলায় তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং সার্বক্ষণিক সহযোগিতা প্রদান। অন্যথায় অদূরভবিষ্যৎ এ আমাদের এর মাশুল গুনতে হবে সেটা স্পষ্ট করে বলা যায়।

বস্তুত কোন কিছু দীর্ঘস্থায়ী নয়। করোনার সংকটও একদিন কেটে যাবে। আমরা আবার ফিরে পাবো আমাদের চির- চেনা শহর- গ্রাম- নগর – রাজধানী। কিন্তু এক্ষেত্রে ধৈর্য্য ধারণের বিকল্প নেই। আর সে সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা আবশ্যক। ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। সকলকে পরম করুণাময় রব ভাল রাখুক, সে প্রত্যাশা রেখে শেষ করছি।

লেখক : তানভীর মোর্শেদ তামীম ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.