যৌতুকের জন্য নববধূকে নির্যাতনের পর হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ

চকরিয়া প্রতিনিধি, কক্সবাজার।

কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের মহুরি পাড়ার আবুবাইদার রানা ওরফে মাসুদ রানা তার নববিবাহিতা স্ত্রী রাসনা বেগমকে নির্যাতন পুর্বক শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন রাসনা বেগমের পরিবার।
ঘটনা বিবরণে জানা যায়, চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড মুসলিম পাড়া নিবাসী মোঃ নুরুল ইসলামের প্রথমা কন্যা মোসাম্মৎ রাসনা বেগম এর সহিত কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড দক্ষিণ মহুরি পাড়াস্থ মনির সওদাগরের ছেলে আবুবাইদার রানার সাথে বিগত ২০১৯সনের নভেম্বর মাসে পারিবারিকভাবে ঝাঁকজমক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
বিয়ের মেহেদীর রং শুকানোর পুর্বেই তাদের দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। বিয়ের ১ মাস পরে রাসনা তার বাপের বাড়িতে আসলে, তার স্বামী আবুবাইদার রানাকে তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতে বললে, সে উল্টো বলে তোমার বাবাকে দিয়ে যেতে বলো এবং আমার ব্যাবসার জন্য দুই লক্ষ টাকা নিয়ে আসো। না হলে আমার ঘরে ঢুকতে দিবোনা, ইত্যাদি ইত্যাদি কথা বলতো বলে জানান রাসনার মা হোসনে আরা। প্রায় একমাস অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরেও মেয়ের শশুর বাড়ি থেকে কেউ মেয়েকে নিতে না আসাতে, সমাজের লোকের মুখে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য (যেমন – এত দুমধাম করে তিন/চার লক্ষ টাকা খরচ করে মেয়ে বিয়ে দিতে না দিতেই কি হলো?) আসবে বলে ভেবে অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাসনার বাবা মেয়েকে তার শশুরবাড়িতে দিয়ে আসেন।
এর পরেই শুরু হলো রাসনার উপর নির্যাতন। রাসনা ফোন করে তার মাকে বলে, বাবা যাওয়ার পরদিনই আমার শাশুড়ী ও আমার স্বামী আবুবাইদার রানা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বলতে থাকে- তুর বাপের বাড়ি থেকে দুই লক্ষ টাকা যদি এনে না দিস তাহলে, তুকে আর কখনো বাপের বাড়িতে যেতে দিব না এবং তোকে খাবার-দাবার না দিয়ে তিলে তিলে মেরে ফেলবো। রাসনা বেগম আরো বলে তার স্বামী আবুবাইদার রানা একজন ইয়াবা সেবক ও ইয়াবা বিক্রেতা। এই কয়দিনে সে তার স্বামীকে ইয়াবা সেবন ও বিক্রি করতে দেখেছে।
এ কথা গুলো রাসনা তার মা-বাবাকে জানিয়ে দিয়েছে শোনার পরে, তার স্বামী আবুবাইদার রানা ও তার মা মিলে অমানুষিক নির্যাতন করে বলে জানান।
এ খবর পেয়ে গত ২৩ এপ্রিল ২০২০ তারিখে রাসনার পিতা নুরুল ইসলাম মেয়ের শশুর বাড়িতে যায়। নুরুল ইসলাম মেয়েকে নিজের বাড়িতে বেড়াতে আনতে চাইলে, মেয়ের শশুর মনির আহমদ, জামাই আবুবাইদার রানা ও তার মা মিলে বিভিন্ন তালবাহানা শুরু করে। মেয়ের শশুর বলে – আপনার মেয়েকে আপনাদের বাড়িতে নিয়ে গেলে তিনশত টাকা মূল্যের ননজুডিশিয়াল স্টাম্পে স্বাক্ষর দিয়ে নিয়ে যেতে হবে। অবশেষে ২৫ এপ্রিল’২০২০ তারিখে স্থানীয় মাতবর খোরশেদ আলম সহ কয়েকজন বসে সিদ্ধান্ত হয় আগামী ৫ মে’২০২০ তারিখ রাসনা বেগমকে তার বাপের বাড়ি যেতে দিবে বলে জানালে, ঐ দিন বিকেলে নুরুল ইসলাম মেয়েকে কোন রকম বুঝিয়ে সুজিয়ে নিজের বাড়ি চকরিয়া উপজেলার হারবাংয়ে চলে আসে।
পরের দিন ২৬ এপ্রিল সকালে মহুরি পাড়ার জৈনক মাতব্বর খোরশেদ আলম তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার ০১৮৬১ ৫২০৪১৬ থেকে ফোন করে আমার মেয়ের মৃত্যুর সংবাদ দিলে, আমি ওনার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করি কিভাবে মারা গেছে? তখন ওনি বলে আপনার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।
মেয়ের মৃত্যুর দুঃসংবাদ পেয়ে, পাগলের মতো করে মেয়ের মা ও ছোট ছেলে মোঃ রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে নুরুল ইসলাম ঝিলংজা ইউনিয়নের মহুরি পাড়ায় মেয়ের শশুর বাড়িতে যায়। সেখানে মেয়েকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। কক্সবাজার সদর মডেল থানার এস আই মোঃ রাশেদ উল্লাহর নেতৃত্ব একদল পুলিশ এসে মেয়ের মৃতদেহ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
মেয়ের বাবা জানান, সদর থানার এস আই রাশেদ আমাকে একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে বলে, আমি স্বাক্ষর করি এবং মেয়ের লাশ নিয়ে আমার বাড়ি হারবাং মুসলিম পাড়ায় চলে এসে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে মেয়েকে দাফন করি।

আসল রহস্য উদঘাটন হলো এর পর, রাসনার মৃত দেহ পাওয়া যায় তার শশুর বাড়ির বাথরুমের সিলিং এর সাথে ওড়না পেচানো ঝুলন্ত অবস্থায় এবং মৃতের পা ফ্লোরের সাথে লাগানো অবস্থায়। মৃত দেহের ছবিতে স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় বাথরুমের দুটি পানির টেব মৃতদেহের হাতের কাছে। স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন জাগে, মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা প্রত্যেকেই কিছু ধরে বাঁচার উপায় খুঁজে। সেদিক দিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যা। মৃতদেহ গোসল করানোর সময় তার শরিরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম ও ক্ষতচিহ্ন রয়েছে এবং গাঢ় মচকানো ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।
এই মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে সবাই তাকিয়ে আছে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের রিপোর্টের দিকে।
এলাকার সচেতন মহল এবং জনসাধারণের একটাই দাবি – কোন অদৃশ্য কালো থাবায় যাতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ফরেনসিক তদন্তের রিপোর্টে কারচুপির আশ্রয় না নেওয়া হয়।
একজন মাদক সেবন ও মাদক কারবারিকে রক্ষা করার জন্য কোনধরনের ষড়যন্ত্রে পা না দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন রাসনার হতভাগা পরিবারের পক্ষ থেকে। এবিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.