ভয়াল ২৯ এপ্রিল ——- যে স্মৃতি আজও কাঁদায় দ্বীপবাসীকে


হুমায়ুন সিকদার

সরা বিশ্বের ন্যায় করোনা নামক মহামারিতে আক্রান্ত দেশ। লকডাউনে দেশবাসী।
এরমধ্যে হাজির ভয়াবহ ২৯ এপ্রিল দিনটি। যে দিন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি শোকাবহ দিন। দুঃসহ সে স্মৃতি এখনও কাঁদায় স্বজনহারা মানুষগুলোকে। সেই ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি বয়ে নিয়ে আবারও উপকূলীয় মানুষের কাছে দিনটি ফিরে এসেছে। আবহাওয়া বার্তা অনুযায়ী ২৯ এপ্রিলের মতো ফের ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড়ের আশংকায় উপকুল বাসী। পবিত্র রমজানে যেনো এধরণের গজব থেকে আল্লাহ আমাদের হেফাজত করেন এমনটাই মুনাজাত মহান রবের কাছে।

সে ২৯ বছর আগে ক্ষতিগ্রস্হ পরিবারগুলোর মাথা গুজার ঠাঁই মেলেনি এখনো।
শত – সহস্র অসহায় পরিবার কুতুবদিয়ার বেডিবাধেঁর বাইরে মানবেতর জীবনযাপন করছে।একইভাবে মহেশখালীর ধলঘাটা ও মাতারবাড়ী পেকুয়ার মগনামা, রাজাখালী ও উজানটিয়া এবং চকরিয়ার বদরখালীতে বেডিবাধেঁর বাইরে অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের ঠাঁই।

ওইদিনের নিহতের সংখ্যা বিচারে স্মরনকালের ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড়গুলির মধ্যে একটি। এটি ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল বাংলাদেশে দক্ষিণপূর্ব চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৫০কিমি/ঘণ্টা বেগে আঘাত করে। এই ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ৬মিটার (২০ ফুট) উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত করে এবং এর ফলে প্রায় ১,৩৮,০০০ মানুষ নিহত হয় এবং প্রায় ১ কোটি মানুষ আশ্রয়হীন ও তাদের সর্বস্ব হারায়।

এখনো উপকূলীয় অনেক এলাকা অরক্ষিত।
বর্ষা আসলে সেই ভয়াল দিনের কথা স্মরণ করে আতংকে থাকে ভুক্তভোগীরা।
সেই কালো রাতের স্মৃতি আজও আমাকে কাঁদায়। যে রাতে ৩/৪ কিমি মা- বাবাকে সাথে নিয়ে পানিতে ভেসেছি।

২৯বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াল স্মৃতি এখনো তাড়া করে সেদিনের ঝড়ে বেঁচে যাওয়া মানুষদের। ওই দিনটের কথা মনে করলে এখনো অনেকে আঁতকে ওঠেন।
ভয়াল ওই ঘটনা এখনও দুঃস্বপ্নের মতো তাড়িয়ে বেড়ায় উপকূলবাসীকে। জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড়ের কথা মনে হলে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় উপকূলবাসীর। ঘটনার এতো বছর পরও নিহতদের লাশ, স্বজন হারানোদের আর্তচিৎকার আর বিলাপের স্মৃতি মুছে ফেলতে পারছেন না তারা।
২৯ এপ্রিলের মধ্যরাতে আঘাত হানা প্রকৃতির নিষ্ঠুর কষাঘাত প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গিয়েছিল কক্সবাজার জেলার মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালীসহ দেশের ১৩টি উপকূলীয় জেলার শত শত ইউনিয়ন। ঘণ্টায় ২০০ থেকে ২৫০কিলোমিটার গতিবেগের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় এবং ২৫ থেকে ৩০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে দেশের উপকূলীয় এলাকা পরিণত হয়েছিল বিরাণভূমিতে। ভয়াবহ ওই ঘূর্ণিঝড়ে মারা যান প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ। যদিও সরকারি হিসেব মতে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার। এতে লাখের উপরে প্রাণ হারিয়ে ছিল।

এতে লাখের উপরে প্রাণ হারিয়ে ছিল শুধু কক্সবাজার উপকূলীয় জনপদে। সম্পদহানি হয়েছিল ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় ১ কোটি মানুষ।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলে কক্সবাজার জেলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো হচ্ছে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা। ওই ঘূর্ণিঝড়ে কুতুবদিয়া দ্বীপে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ মারা যায়। ঘূর্ণিঝড়ের পর সামর্থ্যবান প্রায় মানুষ দ্বীপ ছেড়ে চলে যায় অন্যত্র।

ভয়াল এই ঘুর্ণিঝড়ে উপকুলীয় ১৯ জেলার ১০২ থানা ও ৯টি পৌরসভায় সরকারী হিসাব মতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জন নিহত, ১২ হাজার ১২৫ জন নিখোঁজ, ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৪ জন আহত হয়। মাছ ধরার ট্রলার, নৌকা, বৈদ্যুতিক খুটি, গাছ-পালা, চিংড়ি ঘের, স্কুল-মাদরাসা, পানের বরজ, লাখ লাখ গবাদি পশু, ব্রীজ কালভার্ট ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্থ হয় কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ। তাই ২৯ বছর পরও অতীতের স্মৃতি মুছে ফেলতে পারেনি উপকুলবাসী।

সেদিনের ভয়াল রুপ ঃ
১৯৯১ সাল। ২৯ এপ্রিল, সোমবার। আবহাওয়ার সর্তকবার্তা আর সারাদিনের গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম ও ককসবাজার উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ ছিল শান্ত। বিকেলে বাতাসের গতি বাড়লে দেখা দেয় খানেকটা অজানা আতঙ্ক। সন্ধ্যায় সর্তকবার্তার ধরণ পাল্টে উপকূলীয় এলাকা পরিণত হয় ভূতুড়ে নগরীতে। উপকূলীয় এলাকায় দেখা দেয় আতঙ্ক, শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। আশ্রয় নেয়ার চেষ্টায় যখন ব্যস্ত উপকূলবাসী, ঠিক তখন রাত সাড়ে ৮ট থেকে ৯টার মধ্যে ঘন ঘন পাল্টাতে শুরু করে সর্তকবার্তার বিপদসীমা। বাড়তে থাকে বাতাসের গতিবেগ। বৃদ্ধি পায় সারাদিনের গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মাত্রা। পাল্টে যায় ককসবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ভোলাসহ উপকূলীয় এলাকার দৃশ্যপট। শুরু হয় প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়। আকাশ-বাতাস মাতিয়ে নেমে আসে সীমাহীন মাত্রার বৃষ্টি। ঝড়ো হাওয়ার গতি এতটাই তীব্র ছিল যে, রাতের গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে এর ভয়াবহতা। আকাশে বিজলী চমকানোর মাত্রাটাও যেন ছিল আগুনের ফুলকির মতো। আর বজ্রপাতের শব্দের তীব্রতা ছিল মাটি থেকে আকাশজুড়ে। ঘোর অন্ধকারে খুব কাছ থেকে মানুষের অস্তিত্ব বোঝা না গেলেও, বিজলীর ভয়াবহ ও তীব্র আলো আর বাতাসের শো শো শব্দে উড়ে যাওয়া টিনের আঘাতের বুঝতে কষ্ট হয়নি কারো। প্রায় টানা ৯ ঘণ্টা চলে তাণ্ডব।

রাত ১০টার পর ১০ থেকে ২৫ ফুট উচ্চতায় সাগরের পানি মুর্হুতেই ধেয়ে আসে লোকালয়। জলোচ্ছ্বাস ও ঘুর্ণিঝড়ের তাণ্ডবলীলায় ওই রাতে অনেক মা হারায় সন্তানকে, স্বামী হারায় স্ত্রীকে, ভাই হারায় বোনকে। কোথাও কোথাও গোটা পরিবারই হারিয়ে যায় পানির স্রোতে। ২৯ এপ্রিলের ভয়াল ও দুঃসহ সে স্মৃতি আজও কাঁদায় স্বজনহারা মানুষগুলোকে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৮৯৭ সালে কুতুবদিয়া ও চট্টগ্রামে ঘূর্ণিঝড়ে নিহত হয় ১৭ হাজার ৫ শ মানুষ। ১৯৬০ সালে কুতুবদিয়া, হাতিয়া ও নোয়াখালীতে ২১০ কি.মি. ঘন্টা গতি সম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় ও ৫ মিটার উচ্ছতা সম্পন্ন জলোচ্ছাসে ৬ হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৬৩ সালে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালীতে ২০০ কি.মি. গতিসম্পন্ন ঝড়ে মারা যায় ১২ হাজার মানুষ। ১৯৬৫ সালে কুতুবদিয়া, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও বরিশালে ১৬০ কি. মি. ঘন্টা ৪ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন জলোচ্ছাসে ১৯ হাজার মানুষ মারা যায়।

১৯৮৫ সালে কক্সবাজার চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, নোয়াখালীতে ১৫৪ কি.মি. ঘন্টা ৪ মিটার উচ্চতার জলোচ্ছাসে ১২ হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৯১ সালে কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও বরিশালে ২২৫ থেকে ২৬০ কি.মি বাতাসের গতিবেগে ঘন্টা ৫ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন জলোচ্ছাসে ১ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৯৭ সালে টেকনাফ, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম ১৮০ কি.মি/ঘন্টা ৫ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন জলোচ্ছাসে ২ শত এর অধিক মানুষ মারা যায়।

এছাড়া ১৮২২, ১৮৭৬, ১৯৭০, ১৯৮৫, ১৯৮৮, ২০০৭ ও ২০০৯ সালে সিডর, আইলাসহ বিভিন্ন ধরণের ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় এলাকার ২৬টি জেলায় চরম আঘাত হানে। তবে সবচেয়ে বেশি ৯১ সালের ২৯ এপ্রিল শতাব্দীর ভয়াবহ প্রলয়ঙ্করী-ঘূর্ণিঝড়ে কক্সবাজারের কুতুবদিয়াসহ চট্টগ্রামের কয়েকটি উপকূলীয় এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভয়াবহ জ্বলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়ার খুদিয়ার টেক পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়।

দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার চতুর্পাশে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের
কিন্তু ইতোপূর্বে বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হলেও শেষ হচ্ছেনা দুই বছর ধরে। ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে আতংকে রয়েছে এলাকাবাসী।
দ্বীপবাসী সেনাবাহিনীর মাধ্যমে দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানান প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

উপকুলবাসীর দাবী, তাদের মৌলিক অধিকার মাথাগুজার ঠাঁই করে দেয়া হউক এবং উপকুল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.