কক্স টিভি ডেক্স:  

সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। তবে হাসপাতালের বেঁধে দেয়া নিয়মে স্ত্রীকে সাথে নিতে পাসপোর্টের জরুরি আবেদন করেন কক্সবাজার পাসপোর্ট অফিসে। কিন্তু আবেদনের পর দীর্ঘ সাড়ে তিন মাসেও তা হাতে না আসায় অস্ত্রোপচারে আর ভারত যাওয়া হলো না কক্সবাজারের চকরিয়া ডুলাহাজারা ডিগ্রী কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হেলালীর।

পাসপোর্টটির প্রহর গুনতে গুনতে মাত্র ৪৬ বছর বয়সেই শনিবার ১৮ জানুয়ারি  ভোররাতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন তিনি (ইন্না… রাজেউন)।

এঘটনায় কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক আবু নাঈম মাসুমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

পাসপোর্টটি পেলে ভারত যাওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক থাকতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অধ্যাপক হুমায়ূন ভোর রাত সোয়া ৪টায় আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি টিউমার ও কিডনী জনিত রোগে দীর্ঘদিন দেশে ও ভারতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

অধ্যাপক হুমায়ূন কক্সবাজার সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের লরাবাগের মরহুম মোজাফ্ফর আহমদের ৪র্থ ছেলে। মৃত্যুকালে স্ত্রী, ৩ ছেলে ও অসংখ্য আত্মীয় স্বজন রেখে গেছেন তিনি।

শনিবার (১৮ জানুয়ারি) মাগরিবের নামাজের আগে লরাবাগ কবরস্থান সংলগ্ন মাঠে জানাজার পর তাকে দাফন করা হয় বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছেন ।

ভারতে চিকিৎসা ও ভ্রমণ ভিসা পেতে কক্সবাজারে সহযোগিতাকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পাওয়া তাজ কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারি জানে আলম তার চালিত ‘তাজবি-তাসফি’ নামক ফেসবুকের ওয়ালে গত ১৩ জানুয়ারি অসুস্থ অধ্যাপক হুমায়ূন ও তার স্ত্রীর পাসপোর্ট আবেদন নিয়ে ‘অধ্যাপক হুমায়ুন ও একটি পাসপোর্ট এর পোস্টমর্টেম’ নামে একটি স্ট্যাটাস দেন।

সেখানে জানে আলম লিখেন, ‘বিকাল তিনটা ০১৮৪০২৯৬৭৬৮ মোবাইল নং থেকে আমার ব্যাক্তিগত নম্বরে কল, যথারীতি রিসিভ করলাম। কণ্ঠ পরিচিত তবে তৎক্ষনাত চিনতে না পারলেও আমার পেশাগত পরামর্শ  চাইলে- যতটুকু সম্ভব পরামর্শ  দিলাম।

মনে মনে হুমায়ূন ভাইয়ের কথা স্মরণ হওয়ায় আর কথা না বাড়িয়ে এখন কোথায় আছেন জানতে চাইলে, উনি বলেন- সদর হাসপাতালে ৫০৫ নং কেবিনে ভর্তি  আছেন। আইসিইউ থেকে আজকে কেবিনে স্থানান্তর হয়েছেন।’

উল্লেখ্য, গত ২০-২৫ দিন আগে কেউ একজন এফবিতে ওনার মৃত্যুর খবর স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। অসুস্থতার বিষয়ে আগে জানা ছিল বিধায়- আমিও সঠিক মনে করেছিলাম। বিষয়টি ওনার ফ্যামেলিও অবগত আছেন।

‘বৃহত্তর ঈদগাঁওর জালালাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ লরাবাগ এর কৃতি সন্তান অধ্যাপক হুমায়ূন কবির হেলালী। ডুলাহাজারা ডিগ্রী  কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের একজন অধ্যাপক। প্রায় ছয় মাস আগে হঠাৎ শারীরিক অসুস্থতায় ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে জানতে পারেন অগ্নাশয়ে একটি টিউমার ধরা পড়ে।

সুঠাম দেহের মানুষটি দিন দিন স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে। কোন উপায় না দেখে উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারতের ভেলোরে ডাক্তারের চিকিৎসা করতে যান এবং ডাক্তার অপারেশন করতে হবে বলে পরামর্শ দেন।

শরীরের প্রেসার এবং ডায়বেটিসের অবস্থা খারাপ থাকায় ডাক্তার অপারেশনের ঝুকি না নিয়ে তিন মাসের ট্রিটমেন্ট দেন এবং তিন মাস পরে ফিমেল এটেনডেন্টসহ হাসপাতালে পুনরায় এ্যাপয়মেন্ট দেন।’

‘ভেলোরে ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে-  স্ত্রীর পাসপোর্ট না থাকায় গত ৩ অক্টোবর ব্যাংকে ৬৯০০ টাকা জমা করে জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট এর জন্য আবেদন করেন। পাসপোর্ট ডেলিভারি স্লিপে সম্ভাব্য ১৪ অক্টোবর ডেলিভারী পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ অবদি পাসপোর্ট আর পাওয়া গেল না। কক্সবাজার পাসপোর্ট   অফিসে বার বার যোগাযোগ করলে- জানান হেড অফিসে প্রিন্টিং সেকশনে আছে। কখন পাব জানতে চাইলে- কোন সদুত্তর দেয়নি। আজ ১০০ দিন হল, পাসপোর্ট আর পাওয়া যায়না।

এদিকে, আবেদনকারীর প্রাণপ্রিয় স্বামী হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। যথাসময়ে পাসপোর্ট না পাওয়ায় আর ভারতে উন্নত চিকিৎসা করেতে যেতে পারেন নি।’

‘কাউকে দোষারূপ করার যোগ্যতা আমার নাই। চোখের  সামনে ঘটে যাওয়া কিছু ব্যতিক্রম দেখলে নিজের খুবই খারাপ লাগে তাই সবার সাথে শেয়ার করা।

পরিশেষে হুমায়ুন ভাইয়ের সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া কামনা করছি। বি.দ্র. পাসপোর্ট যথা সময়ে পাসপোর্ট না পাওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার প্রয়োজন মনে করিনি। কারণ পেশা আমার সাংবাদিকতা নয়। ধন্যবাদ সবাইকে- জানে আলম, তাজ কর্পোরেশন, লালদিঘীর পাড়, কক্সবাজার।’

এ লেখাটি নজরে এলে পড়া অসংখ্য মানুষ পাসপোর্ট অধিদপ্তরের দায়িত্ব জ্ঞানহিনতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

চাইলে তিনদিনে সরবরাহ দেয়া যায়, এমন একটি পাসপোর্ট ১১০দিনেও হাতে পায়নি হুমায়ূনের স্ত্রী। এরই মাঝে শনিবার (১৮ জানুয়ারি) ভোররাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অধ্যাপক হুমায়ূন। তার মৃত্যুতে স্ত্রী-সন্তানের আহাজারি হাসপাতালের পরিবেশ ভারি করে তুলে। স্ত্রী বার বার বলছিলেন, যথাসময়ে পাসপোর্টটি পেলে হয়তো মানুষটি সুস্থতার দিকে এগিয়ে আরো কিছুদিন তাদের সাথে বিচরণ করতো।

তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঝড় উঠে ফেসবুকে। তার স্ত্রীর মতো অনেকের অভিমত পাসপোর্টটির কারণে তার যথাযথ চিকিৎসা সম্ভব হয়নি।

কক্সবাজার সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান চৌধুরী লিখেছেন,  ‘একটি পাসপোর্টের করুন মৃত্যু । কাল যেটা মিথ্যা ছিল, আজকে তা সত্যি হল। এ ভাবে টাকার জন্য আর কত মানুষকে হত্যা করবে পাসপোর্ট কমর্কতারা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে হুমায়ূন ভাইয়ের সহধর্মিণীর আবেক ভরা স্ট্যাটাস, পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের মন গলাতে পারেনি। ঠিক সময়ে পাসপোর্টটি হাতে পেলে হইতো ঠিক সময়ে চিকিৎসা করা যেত। তাহলে যাদের গাফেলতির কারণে আজকে একজন শিক্ষকের করুন মৃত্যু হল তার দায়কে নেবে?? আল্লাহ প্রিয় ভাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন আমিন।’

কক্সবাজারের সিনিয়র সাংবাদিক শাহজাহান চৌধুরী শাহীন তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেন, “পাসপোর্টের কারণে অকালে ঝরে গেলেন প্রভাষক হুমায়ুন ভাই”
কক্সবাজারের চকরিয়া ডুলাহাজারা ডিগ্রী কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হেলালী ভাইয়ের অকাল মৃত্যুতে আমি গভীর শোকাহত।
আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুক, আমিন।
একটি পাসপোর্টের করুণ মৃত্যু, একটি স্বপ্নের অকালে ঝরে পড়ার কারণে হাজারো স্বপ্নের মৃত্যু হলো !! একটি পার্সপোটের কারণে একজন মেধাবী শিক্ষকের করুন মৃত্যেু এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। আর কতো প্রাণ এভাবে অকালে ঝরে পড়বে। আমরা কখন সচেতন হবো।
কাল যেটা মিথ্যা ছিল, আজকে তা সত্যে হল। এ ভাবে টাকার জন্য আর কত মানুষকে হত্যা! করবে কক্সবাজার পাসপোর্ট কমর্কতারা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক পেইজে অসুস্থ হুমায়ন ভাইয়ের সহধর্মিণীর আবেগঘন স্ট্যাটাস, অনেক আকুতি, এরপরেও পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের মন গলাতে পারেনি।
ঠিক সময়ে পাসপোর্টটা হাতে পেলে হইতো ঠিক সময়ে চিকিৎসা করতে পারতো, বেঁচে যেত একজন মেধাবী প্রভাষকের প্রাণ।
যাদের গাফেলতির কারণে আজকে একজন শিক্ষকের করুন মৃত্যে হলো, তার দায়ীকে নেবে ?? এভাবে আর কতো স্বপ্নের মৃত্যু হলে আমাদের বোধোদয় হবে।
আমরা আর নিষ্প্রাণ চাই না, আসুন আমরা সোচ্চার হই, মানুষের মৃত্যু নিয়ে খেলা করা মানুষ রুপি অমানুষ গুলোকে বয়কট করি।

তবে, পাসপোর্টটি জরুরি ভিত্তিতে না পাওয়ার বিষয়ে জানতে কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক আবু নাঈম মাসুমের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করেও সংযোগ না পাওয়ায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।