“নিজেই কবরে নেমে মার শরীর আঁকড়ে ধরে শুইয়ে দিয়েছি বাবার পাশে কবরে “

“নিজেই কবরে নেমে মার শরীর আঁকড়ে ধরে শুইয়ে দিয়েছি বাবার পাশে কবরে “

নিজেই কবরে নেমে মার শরীর আঁকড়ে ধরে শুইয়ে দিয়েছি বাবার পাশে কবরে “

জননী জন্মদাত্রী দুগ্ধদায়িনীকে অনন্তকালের জন্য কবরে শায়িত করে দিলাম । মায়ের ছিল ডায়বেটিকস, স্ট্রোকও করেছিল বেশ ক’বছর আগে। এরমাঝে গত তিনদিন মায়ের বমি আর ডায়রিয়া। রোববার রাতে তার চিকিৎসা ভালো ভাবেই শুরু হল । স্যালাইন পুশ করল চিকিৎসক। আট ঘণ্টার মধ্যেই তার পূর্ব চেহারা ফিরে এলো এক স্যালাইনের গুনে । গত তিন চারটি বছর কথা বলতে পারেনি। প্রতি দিনের ন্যায় সোমবারের দিনটা শুরু হলো। সোমবার সকালে কিছু শব্দ উচ্চারন করতে শুরু করেছেন । তার হাত পায়ের অনড় ভাবটা দূর হচ্ছে । আরো একটা স্যালাইন আর কিছু ওষুধ কেনা হলো। সোমবার সকালে ডাক্তাররা আবারো স্যালাইন লাগাবেন, কিন্তু না , আমাদের সব আশা ছেড়ে তিনি মেঝ আপুর বুকে নেতিয়ে পড়লেন। আল্লাহ আল্লাহ ডাকা শুরু করলেন। ১০/১২টি ঘণ্টা মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে মা হেরে গেলেন।
সকাল পৌনে ১১টায় ফোন এলো- চলে আসো, মা নেই। এই খবরটা আমার কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত আর অনাকাঙ্ক্ষিত। সকালে সেই দুসংবাদ পেয়ে ছুটলাম গ্রামের বাড়িতে। নিথর দেহটা পড়ে আছে। সবদিকে সবার আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। কিন্তু মা নির্বাক। মায়ের নিথর দেহটা সবাই পাহারা দিচ্ছে। তার শরীর তখনও গরম। তার চেহারা দেখে মনেই হচ্ছিলনা তিনি অসুস্থ ছিলেন ।
বাবাকে হারালাম সেই ২৩টি বছর আগে। এই ২৩ টি বছর একাকীত্বের অসহনীয় জীবন যাপনের পর মা আজ বাবার কাছে চলে গেলেন । এই ২০২০ সালে মার বয়স ৭০ হতো । সোমবার (১৬ ডিসেম্বর) বাদ আসর আমার বাড়ির পার্শ্বে মধ্যম নাপিতখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে মায়ের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে নিজেই কবরে নেমে মার শরীর আঁকড়ে ধরে শুইয়ে দিয়েছি বাবার পাশে কবরে । তার মাথার বাঁধন আলগা করে উঠে এলাম । কবরে একমুঠো মাটি প্রথম আমিই দিলাম।
সেই সময় খুব বেশি মনে পড়ে গেলো।
খুব ছোট থাকতে মায়ের ডানদিকে শুতাম আমি । ঐ সময় আমার বাম পা খানি তার পেটের উপর উঠিয়ে ঘুমোতাম । অনেক বছর মায়ের সাথে ঘুমিয়েছি । এরপর বেঁচে থাকার তাগিদে শহুরে জীবন ।
বাবাকে হারিয়েছি সেই ১৯৯৬ সালে। মায়ের কঠোর নিয়ন্ত্রণে সংসার , আমাদের সব সম্পদ ছিল মায়ের হাতে। বাবা হীন সংসার কেমন হয় তা বুঝতে দেয়নি মা। হায়রে মা, তুমি আজ অনন্তকালে।
মা..কে দেবে এখন মোচা দিয়ে চিংড়ি ভুনা , আর নারকেলের দুধ দিয়ে গলদা চিংড়ি যেন সেধে সেধে খেতে, রসওয়ালাকে আদেশ কে করবে, রস চাই পায়েস হবে । চাউলের গুড়ো দিয়ে পিঠে হবে , রাত জেগে মা চিতই পিঠে বানিয়ে খেজুর রস আর নারকেল মিশিয়ে সারা রাত ভিজিয়ে ভোরে প্লেট ভরে তুলতুলে নরম পিঠা নিয়ে বিছানার পাশে দাড়িয়ে বলতেন বাবা ওঠ , খেয়ে নে।
মা মারা যাবার একঘন্টা আগেও বুঝিনি মাতৃ বিচ্ছেদের যন্ত্রনা । আজ থেকে বাবা আর মা হারা হয়ে গেলাম।
মায়ের মুখখানি বার বার ভেসে উঠছে।
আল্লাহ আমার মাকে জান্নাতবাসী করুক, আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Application to the Ministry of Information for registration.